পশ্চিম ইরাকে বিধ্বস্ত হওয়া মার্কিন সামরিক বাহিনীর জ্বালানি সরবরাহকারী (রিফুয়েলিং) বিমানটি নিয়ে সামনে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গেছে, বিমানটিতে থাকা ক্রুদের জীবন বাঁচানোর জন্য কোনো প্যারাসুট বা ইজেকশন সিটই ছিল না।

বৃহস্পতিবারের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা ছয়জন ক্রু সদস্যের সবাই নিহত হয়েছেন। মার্কিন বিমান বাহিনীর এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

বিধ্বস্ত বিমানটি ছিল একটি কেসি-১৩৫ (KC-135) স্ট্রাটোট্যাঙ্কার। বিশাল আকারের এই বিমানগুলো মূলত মাঝ-আকাশে অন্য যুদ্ধবিমান বা বোমারু বিমানকে জ্বালানি সরবরাহ করার কাজে ব্যবহৃত হয়।

মার্কিন বিমান বাহিনীর ওই কর্মকর্তা জানান, কার্গো বা মালবাহী বিমানের মতোই এই ট্যাঙ্কার বিমানগুলোতেও মাঝ-আকাশে জরুরি অবস্থায় বেরিয়ে আসার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। অর্থাৎ বড় ধরনের বিপদের সময় ক্রুরা বিমান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না।

পেন্টাগনের সামরিক কৌশল অনুযায়ী, কেসি-১৩৫ বিমানগুলোকে সাধারণত সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র বা উচ্চ ঝুঁকির এলাকা থেকে দূরে রাখা হয়। নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করেই তারা অন্য যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সরবরাহ করে।

এই কারণেই যুদ্ধবিমানের মতো ইজেকশন সিট বা প্যারাসুটের ব্যবস্থা এসব বিমানে রাখা হয় না।

কর্মকর্তা আরও জানান, মাঝ-আকাশে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা দুর্ঘটনা ঘটলে ক্রুদের প্রধান কাজ হয় বিমানটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং যতটা সম্ভব নিরাপদে অবতরণের চেষ্টা করা।

তার ভাষায়, “আকাশে এই বিমান থেকে ইজেকশন বা বেরিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই।”

তবে যদি এমন অবতরণ পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখান থেকে বেঁচে ফেরা সম্ভব, সেজন্য ক্রুরা নিয়মিত বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। কিন্তু বৃহস্পতিবারের ঘটনায় সেই সুযোগটুকুও আর মেলেনি।

রহস্যে ঘেরা দুর্ঘটনা

বৃহস্পতিবারের ঘটনাটি এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মাঝ-আকাশে অন্য একটি বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলেই কেসি-১৩৫ বিমানটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিধ্বস্ত হয়।

এই দুর্ঘটনায় একটি বিমান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং তাতে থাকা ছয়জন ক্রুর সবাই প্রাণ হারান।

তবে দ্বিতীয় একটি ট্যাঙ্কার বিমানও সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেটি কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করতে সক্ষম হয়।

তদন্ত শুরু করেছে সেন্টকম

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) শুক্রবার নিশ্চিত করেছে যে ছয়জন ক্রু সদস্যের সবাই নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

তারা স্পষ্ট করে বলেছে, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে শত্রুপক্ষ বা মিত্র বাহিনীর কোনো গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। প্রাথমিকভাবে এটিকে দুর্ঘটনা বলেই মনে করা হচ্ছে।

দায় স্বীকারের দাবি

অন্যদিকে, ইরানের অনুগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘দ্য ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ দাবি করেছে যে তারা বিমানটি ভূপাতিত করেছে।

তবে এই দাবির পক্ষে তারা কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। মার্কিন সামরিক বাহিনীও এই দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। কারণ তাদের প্রাথমিক তদন্তে হামলার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রকাশ্যে এলো বিধ্বস্ত বিমানের ছবি

ইসরায়েলি গণমাধ্যম কেএএন (KAN) বিধ্বস্ত কেসি-১৩৫ বিমানের কিছু ছবি প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যায়, বিমানটির লেজের অংশ বা টেইল ফিন পুরোপুরি নিখোঁজ।

এই ছবি মাঝ-আকাশে সংঘর্ষের তত্ত্বকে আরও জোরালো করছে।

ছবিতে থাকা মার্কিং দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বিমানটি ক্যালিফোর্নিয়ার বিল এয়ার ফোর্স বেসের ৯৪০তম এয়ার রিফুয়েলিং উইংয়ের ছিল।

মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এই ঘটনাকে ‘মর্মান্তিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। নিহত সেনাদের তিনি ‘আমেরিকান হিরো’ বলেও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

 

news