আমেরিকার গোয়েন্দা তথ্য আর ইসরায়েলের সরাসরি মদদে ইরানের ওপর দফায় দফায় বিমান হামলা চালিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত! এমনকি যুদ্ধবিরতির মধ্যেও থামেনি এই কাপুরুষোচিত আগ্রাসন। কিন্তু ইরান কি চুপ করে বসে ছিল? মাত্র কয়েক দিনে ২ হাজার ২৫০টি ড্রোন আর ৫৫০টি ব্যালাস্টিক মিসাইল দিয়ে পুরো আরব আমিরাতকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার হুঙ্কার দিয়েছে তেহরান। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনটির বিস্তারিত জানতে সঙ্গেই থাকুন।

মধ্যপ্রাচ্যের বুকে এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক খেলার পর্দা উন্মোচিত হয়েছে যা পুরো বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য সমর্থন এবং ইসরায়েলের সরাসরি প্ররোচনায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের ওপর একের পর এক বিমান হামলা চালিয়েছে। আমেরিকার বিখ্যাত পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এই গোপন চক্রান্তের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে যা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করছে।

পশ্চিমা গণমাধ্যমের এই প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে ইরানের সার্বভৌমত্বকে ধ্বংস করার জন্য তারা কতটা মরিয়া ছিল। প্রথম থেকেই আমেরিকা এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানকে দুর্বল করার জন্য আরব আমিরাতকে যুদ্ধের ময়দানে নামিয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন থেকেই আরব আমিরাতের যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের ওপর ডজন খানেক বিমান হামলা চালায় যা সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।

এই হামলায় পর্দার আড়াল থেকে মূল ভূমিকা পালন করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবং ইসরায়েলের ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠী। তারা ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এলাকাগুলোর নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য আরব আমিরাতের কাছে হস্তান্তর করেছিল। এই ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের হরমুজ প্রণালীতে অবস্থিত কিশ ও আবু মুসা দ্বীপ এবং বন্দর আব্বাস অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামোরিক শক্তি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া।

ইহুদিবাদী ইসরায়েল এবং আরব আমিরাতের এই যৌথ হামলায় ইরানের লাভান দ্বীপের তেল শোধনাগার এবং আসালুয়েহ পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সকে টার্গেট করা হয়েছিল। এই আসালুয়েহ হলো ইরানের জ্বালানি খাতের মূল চালিকাশক্তি যা দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত। পশ্চিমা শক্তিগুলো ভেবেছিল এখানে আঘাত করলেই ইরান হয়তো আত্মসমর্পণ করবে কিন্তু তেহরানের বীর যোদ্ধারা তাদের সেই অন্যায় চক্রান্তের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছে।

আসালুয়েহ পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে ইসরায়েলের এই বর্বর হামলার পর পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে স্বয়ং আমেরিকাও ভয় পেয়ে গিয়েছিল। মার্কিন প্রশাসন তখন তড়িঘড়ি করে তেল আবিবকে নির্দেশ দেয় যেন তারা ইরানের জ্বালানি খাতে আর কোনো বড় হামলা না করে। কারণ আমেরিকা খুব ভালো করেই জানত ইরানের পাল্টা আঘাত এলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজার এক নিমেষেই ধ্বংস হয়ে যাবে।

ইরানের ওপর এই কাপুরুষোচিত হামলার মূল কারণ ছিল তেহরানের স্বাধীন ও শক্তিশালী অবস্থান যা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সহ্য করতে পারে না। পশ্চিমা শক্তিগুলোর অন্যায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইরান যেভাবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে তা তাদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। তাই আরব আমিরাতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ইসরায়েল ইরানের বিশাল জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করার এক নোংরা ও ব্যর্থ আত্মঘাতী খেলায় মেতে উঠেছিল।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই গোপন নথিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে যা আরব বিশ্বের ভেতরের ফাটলকে স্পষ্ট করে। আরব আমিরাতের এই আগ্রাসী ভূমিকার কারণে প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরব চরম ক্ষুব্ধ এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। রিয়াদ তখন মার্কিন প্রশাসনের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে যেন তারা অবিলম্বে আমিরাতের এই পাগলামি এবং ইরানের ওপর বিমান হামলা চালানো বন্ধ করতে বাধ্য করে।

সৌদি আরব খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল যে ইরানের ওপর হামলা হলে পুরো অঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলো জ্বলবে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে যা কোনো দেশের পক্ষেই সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। তাই তারা আরব আমিরাতকে সামোরিক পথ পরিহার করে ইরানের সাথে কূটনৈতিক উপায়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার অন্ধ সমর্থনে আমিরাত তখন সম্পূর্ণ যুদ্ধংদেহী মনোভাব বজায় রেখেছিল।

কিন্তু ইরান কোনো সাধারণ দেশ নয় যে অন্যায়ভাবে আঘাত করলে তারা চুপচাপ সহ্য করে ঘরে বসে থাকবে। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ই এপ্রিলের মধ্যে তেহরান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব পাল্টা জবাব দেয়। ইরান একযোগে প্রায় ৫৫০টি অত্যাধুনিক ব্যালাস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল এবং ২২ শ এর বেশি আত্মঘাতী ড্রোন আরব আমিরাতের সামোরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করে।

ইরানের এই অতর্কিত ও প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে আরব আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল। আরব আমিরাতের নিজস্ব নথিতেই স্বীকার করা হয়েছে যে ইতিহাসে তারা কখনো এত বড় এবং ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখোমুখি হয়নি। এমনকি ইসরায়েলের চেয়েও বেশি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত সরাসরি আছড়ে পড়েছে আমিরাতের বুকে যা তাদের অহংকার এবং পশ্চিমা প্রযুক্তির অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো এপ্রিল মাসে যখন আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্থতায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল তখনও আমিরাত থামেনি। এই যুদ্ধবিরতির পবিত্রতা লঙ্ঘন করে আরব আমিরাত ও ইসরায়েল গোপনে ইরানের ওপর বেশ কয়েকবার ড্রোন হামলা চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ইরানের শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রতিটি হামলা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নস্যাৎ করে দেয় এবং দেশের আকাশসীমাকে শতভাগ সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়।

সম্প্রতি আরব আমিরাত ও ইসরায়েলি জোট ইরানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে নাশকতামূলক হামলা চালিয়েছিল। পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার মতো এই আন্তর্জাতিক অপরাধ তারা ঘটিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ ইশারায়। কিন্তু ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে তাদের সেই ঘৃণ্য চক্রান্তের মূল লক্ষ্য অর্জিত হয়নি এবং হামলাকারীরা উল্টো চরম পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

এই যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি নোংরা সত্য পুরোপুরি উন্মোচিত হয়েছে যা মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। ইরানের বিরুদ্ধে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আরব আমিরাত এখন সম্পূর্ণভাবে ইহুদিবাদী ইসরায়েলের পায়ে গিয়ে মাথা নত করেছে। ইসরায়েল তাদের সুরক্ষার জন্য আরব আমিরাতে নিজেদের তৈরি বিতর্কিত আয়রন ডোম ব্যাটারি এবং তা পরিচালনার জন্য ইহুদি সেনা দল মোতায়েন করে রেখেছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সূত্রমতে ইসরায়েলের ডজন খানেক সেনা কর্মকর্তা এখনও আমিরাতের মাটিতে অবস্থান করে সামোরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এটি প্রমাণ করে যে আরব আমিরাত এখন স্বাধীন কোনো রাষ্ট্র নয় বরং ইসরায়েলের একটি সামোরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা ও ইহুদিবাদী শক্তির এই যৌথ দাসত্ব মেনে নিয়ে আমিরাত নিজের দেশের জনগণকে এক চরম যুদ্ধের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এই যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় বহু সামোরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তা অত্যন্ত গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছিলেন। এমনকি ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বয়ং দাবি করেছেন যে তিনি নিজে গোপনে আবুধাবি সফর করে এসেছেন। যদিও লোকলজ্জার ভয়ে আবুধাবি কর্তৃপক্ষ এই খবরটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে কিন্তু সত্য কখনো চাপা দিয়ে রাখা যায় না।

আসলে এই নোংরা বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া সেই কুখ্যাত 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস' চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তির আড়ালে আরব আমিরাত এবং ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের মধ্যে কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। কিন্তু এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান ইসলামিক শক্তি এবং স্বাধীনচেতা মনোভাবকে দমন করার জন্য একটি যৌথ সামোরিক ফ্রন্ট গড়ে তোলা।

আমেরিকা ও ইসরায়েল ভেবেছিল এই জোটের মাধ্যমে তারা ইরানকে কোনঠাসা করে ফেলবে কিন্তু তাদের সেই গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছে তেহরান। ইরান আজ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি দূরপাল্লার হাইপারসনিক মিসাইল এবং ড্রোন দিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছে। পশ্চিমা শক্তির কোনো আধুনিক প্রযুক্তি বা পেন্টাগনের কোনো চক্রান্তই ইরানের এই অদম্য অগ্রযাত্রাকে এক চুলও দমাতে পারেনি এবং পারবেও না।

যেখানে ইসরায়েল প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে সেখানে আরব আমিরাতের মতো মুসলিম দেশ তাদের সাথে হাত মিলিয়েছে। তারা মুসলিম উম্মাহর পিঠে ছুরি মেরে ইরানের মতো একটি প্রতিরোধকামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। কিন্তু ইরানের সাহসী নেতৃত্ব প্রমাণ করেছে যে মুসলিম বিশ্বের প্রকৃত অভিভাবক কারা এবং কারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে জানে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই বিস্ফোরক রিপোর্ট প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং ইসরায়েলি আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে এসেছে। তারা এখন সরাসরি যুদ্ধ করার সাহস হারিয়ে আরব দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার এই নোংরা নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু তেহরানের অকুতোভয় প্রতিরোধ ও সামোরিক কৌশলের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত আধুনিক যুদ্ধ পরিকল্পনা বারবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে।

Walton Ads