কাতারকে ইহুদি জাতির শত্রু এবং কানাডাকে ইহুদিবিদ্বেষের চারণভূমি আখ্যা দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ফ্রান্সে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত জশুয়া জারকা। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ফরাসি উদ্যোগকে কেন্দ্র করে ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সম্পর্কও নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাসে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাতার, কানাডা এবং ফ্রান্সের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছেন ফ্রান্সে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত জশুয়া জারকা। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেওয়া এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
রাষ্ট্রদূত জারকা দাবি করেন, দুই হাজার তেইশ সালের সাত অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন অভিযানের পর বিশ্বব্যাপী যে ইহুদিবিদ্বেষ বেড়েছে, তার কারণ ইসরায়েলের সামরিক প্রতিক্রিয়া নয়। বরং তিনি এর জন্য ইসরায়েলবিরোধী শক্তির মধ্যে তৈরি হওয়া তথাকথিত বিজয় উল্লাসকে দায়ী করেন। একই সঙ্গে তিনি কাতারকে শুধু ইসরায়েলের নয়, বরং গোটা ইহুদি জাতির শত্রু হিসেবে বর্ণনা করেন। তার অভিযোগ, কাতার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থায়নের মাধ্যমে ইহুদিবিরোধী মনোভাবকে উৎসাহিত করছে এবং এই প্রবণতা ধীরে ধীরে ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ছে।
একই সাক্ষাৎকারে কানাডার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় ইহুদিদের জন্য নিরাপদ বলে পরিচিত কানাডা এখন সেই অবস্থান হারিয়েছে। তিনি দাবি করেন, সেখানে ইহুদি উপাসনালয় ও সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে। এই পরিস্থিতির জন্য তিনি অভিবাসন প্রবণতা এবং পশ্চিমা বিশ্বের কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনকে দায়ী করেন।
তবে রাষ্ট্রদূতের এসব মন্তব্যকে একপেশে ও বিতর্কিত বলে আখ্যা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ। তাদের মতে, কাতার দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি, জিম্মি মুক্তি এবং শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে পুরো দেশকে ইহুদি জাতির শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও দায়িত্বশীল বক্তব্যের পরিপন্থী।
বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় চলমান সামরিক অভিযান, ব্যাপক প্রাণহানি এবং মানবিক সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়তে থাকায় ইসরায়েল এখন অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ও মানবাধিকারভিত্তিক সমালোচনাকে ইহুদিবিদ্বেষ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। তারা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও মানবাধিকারকর্মীদের প্রতিবাদকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে চিত্রিত করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নও উত্থাপন করছে।
এদিকে ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সম্পর্ক নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রদূত জারকা। তিনি স্বীকার করেন, দুই দেশের সম্পর্ক বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় অতিক্রম করছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর ফরাসি সীমাবদ্ধতা, সামরিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে বাধা এবং ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের আহ্বানকে তিনি এই সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ফরাসি উদ্যোগকে ইসরায়েল একটি কৌশলগত ভুল বলে মনে করছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ মনে করে, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্ত। বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব, বসতি সম্প্রসারণ এবং গাজায় সামরিক অভিযানের কারণে ইসরায়েল ক্রমেই আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ছে। তাদের দাবি, মিত্র দেশগুলোর উদ্বেগ ও সমালোচনাকে গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো তাদের অভ্যন্তরীণ নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইসরায়েলের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করতে পারে।
সব মিলিয়ে, কাতার ও কানাডাকে ঘিরে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের সাম্প্রতিক মন্তব্য শুধু নতুন বিতর্কই সৃষ্টি করেনি, বরং ফ্রান্স-ইসরায়েল সম্পর্কের বিদ্যমান উত্তেজনাকেও আরও সামনে নিয়ে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
