বিশ্ব রাজনীতিতে এক মহাপ্রলয় ঘটে গেছে! যে ডোনাল্ড ট্রাম্প এতদিন ন্যাটোকে একঘরে করে রেখেছিলেন, ইউরোপের মিত্রদের পাত্তাই দিতে চাননি, আজ সেই ট্রাম্পকেই বাঁচতে ইউরোপের হাত ধরতে হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন এবং ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র পর পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন জ্বলছে। হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ, বিশ্ববাজারে তেলের হাহাকার, আর আমেরিকার সামরিক শক্তির অহংকার আজ খাদের কিনারায়! চীন, রাশিয়া আর ইরানের এই ত্রিমুখী অক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে হোয়াইট হাউজ আজ বুঝতে পারছে—একা লড়াই করার দিন শেষ। আজ আমরা উন্মোচন করব সেই পর্দার পেছনের আসল রহস্য, যা বিশ্ব মিডিয়া আপনার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখছে। কেন মহাপরাক্রমশালী আমেরিকাকে আজ টিকে থাকার জন্য ইউরোপের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে।

আমেরিকার বিশ্বব্যাপী সামরিক আধিপত্য আজ এক অভূতপূর্ব এবং অত্যন্ত জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকেরা এখন খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন যে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে এককভাবে নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার দিন ক্রমশ শেষ হয়ে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ইরানের অনমনীয় মনোভাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাগুলোকে বিশ্বের সামনে খুব স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করে দিয়েছে।

ন্যাটোর বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটে সম্প্রতি ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী বৈঠক সম্পন্ন করেছেন। এই বৈঠকের ঠিক পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত ট্রাম্প ক্রমাগত ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর তীব্র সমালোচনা করে আসছিলেন এবং তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন। ট্রাম্পের মূল অভিযোগ ছিল যে ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলো পর্যাপ্ত সামরিক ও কৌশলগত ভূমিকা পালন করছে না।

ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চালানো বিশাল সামরিক অভিযান সত্ত্বেও তেহরানকে পুরোপুরি দমন করা বা নতজানু করা সম্ভব হয়নি। এর ওপর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি সরবরাহে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। ন্যাটো প্রধানের এই ওয়াশিংটন সফর এমন এক সময়ে ঘটল যখন আমেরিকার সামরিক সক্ষমতার সীমা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।

আমেরিকার এই সামরিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে চীন, রাশিয়া এবং ইরানের মধ্যকার গভীর ও কৌশলগত সহযোগিতা এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এই শক্তিশালী অক্ষের ক্রমবর্ধমান উত্থান ওয়াশিংটনকে একটি অত্যন্ত কঠোর ও বাস্তবসম্মত বার্তা দিচ্ছে যে আমেরিকা এখন আর বিশ্বমঞ্চে একা চলতে পারবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটো ইতিমধ্যে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি উপলব্ধি করে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বেশ কিছু সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছে।

আমেরিকান জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক আধিপত্য অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুরক্ষিত হবে যদি ওয়াশিংটন ইউরোপের এই নতুন পদক্ষেপগুলোকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে একান্ত বৈঠকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে বলেছেন যে ইউরোপ এখনো এই ঐতিহাসিক সামরিক জোটের প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রুটে ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে ব্যতিক্রমী যিনি ইউরোপের নিরাপত্তায় আমেরিকার অপরিহার্য ভূমিকাকে সবসময় প্রকাশ্যে স্বীকার করেন।

মার্ক রুটের এই বাস্তবসম্মত এবং দূরদর্শী বার্তাটি শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসের নীতিনির্ধারকদের মনে এবং ট্রাম্পের চিন্তাভাবনায় গভীরভাবে রেখাপাত করতে সক্ষম হয়েছে। এই বৈঠকের পর থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে ন্যাটোর বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই পরিচিত এবং তীব্র আক্রমণাত্মক বক্তব্যগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। ট্রাম্প এখন বুঝতে পারছেন যে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় মিত্রদের চটিয়ে চলা আমেরিকার জন্য আত্মঘাতী হবে।

বৈঠকে রুটে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে ফ্রান্স এবং স্পেন তাদের আকাশসীমা মার্কিন সামরিক বিমান ব্যবহারের অনুমতি দিতে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে এই প্রতিকূলতার মধ্যেও জার্মানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো সদস্যরা আমেরিকার পাশে দাঁড়িয়েছে এবং তাদের বিমান ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে দিয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছে। এই দেশগুলোর সাধারণ মানুষ যুদ্ধ সমর্থন না করলেও তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আমেরিকার সাথে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।

সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটে এমন এক সময়ে ন্যাটোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন যখন ইউরোপীয় সদস্যরা অবশেষে তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা উদাসীনতা কাটিয়ে উঠছে। ন্যাটোর ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের একটি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ইউরোপ এবং কানাডার সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যয় এক বছরে প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ইউরোপ এখন আর আমেরিকার সামরিক চাদরের নিচে শুধু আশ্রয় নিয়ে বসে থাকতে রাজি নয়।

২০১৪ সালের ওয়েলস সম্মেলনের পর এই প্রথম ন্যাটোর প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র তাদের মোট জিডিপির ন্যূনতম ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করছে। পোল্যান্ড, লাটভিয়া এবং লিথুয়ানিয়ার মতো দেশগুলো আরও এক ধাপ এগিয়ে ২০২৫ সালের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের জিডিপির ৩.৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ করেছে। এর পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত ১.৫ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগ করতে সম্মত হয়েছে ইউরোপ।

ইউরোপের এই সামরিক প্রস্তুতি একেবারেই সঠিক সময়ে নেওয়া হয়েছে কারণ বিশ্বজুড়ে ন্যাটোর শত্রুরা এখন অনেক বেশি আগ্রাসী ভূমিকা পালন করছে। রাশিয়া যখন ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে প্রতিনিয়ত অত্যাধুনিক সশস্ত্র ড্রোন এবং দূরপাল্লার রকেট দিয়ে হামলা চালাচ্ছে, তখন ইরানও চুপচাপ বসে নেই। তেহরান বিভিন্ন সামরিক সংঘাত ও পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়েছে যে তারা কতখানি বিপজ্জনক এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কতটা শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

চলতি যুদ্ধের শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরান ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। শুধু তাই নয়, এর কিছুদিন আগেই সাইপ্রাসে অবস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ বিমান ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোন সফলভাবে আঘাত হেনেছিল। এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট সংকেত দেয় যে পুতিনের পূর্ব ইউরোপ দখলের পরিকল্পনার চেয়েও বড় হুমকি এখন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তৈরি হচ্ছে।

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সবচেয়ে বড় সত্য হলো যে আমেরিকার সাধারণ নাগরিক এবং ইউরোপের মানুষ এক নতুন ও বিপজ্জনক পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বকে এখন এই তেতো সত্যটি মেনে নিতেই হবে যে সামরিক ফলাফলের ওপর তাদের যে একক একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, তা চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। ইরানের সাথে এই যুদ্ধ এটি প্রমাণ করেছে যে বেইজিং, মস্কো এবং তেহরান কীভাবে একে অপরকে রক্ষা করছে।

ইরানের প্রতি রাশিয়ার শুধুমাত্র রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সমর্থনই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ক্রেমলিন সরাসরি মার্কিন সামরিক বাহিনীর অবস্থান সংক্রান্ত অত্যন্ত গোপন গোয়েন্দা তথ্য তেহরানের সাথে শেয়ার করছে। এই নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই সৌদি আরবে অবস্থিত আমেরিকার অত্যন্ত সুরক্ষিত ‘প্রিন্স সুলতান এয়ারবেস’-এ নিখুঁত ও মারাত্মক হামলা চালানো সম্ভব হয়েছিল। ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাও সম্প্রতি এই তথ্যটির সত্যতা পুরোপুরি নিশ্চিত করেছে।

অন্যদিকে চীন এই অক্ষের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে এবং তারা ইরানকে বিভিন্ন দ্বৈত-ব্যবহারের সামগ্রী ও যুদ্ধ উপকরণ সরবরাহ করছে। এর মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক নেভিগেশন প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর চিপস এবং সলিড রকেট প্রোপেলান্ট তৈরির জন্য অপরিহার্য উপাদান সোডিয়াম পারক্লোরেট, যা সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। বেইজিংয়ের এই প্রযুক্তিগত সহায়তা তেহরানের সামরিক বাহিনীকে অনেক বেশি আধুনিক ও নিখুঁত করে তুলেছে।

তেহরানের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে এবং তাদের কোষাগার সচল রাখতে বেইজিং গত বছর ইরান থেকে রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীন গত বছর প্রায় ৫২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল কিনে ইরানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১.৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কিনে চীন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

ন্যাটোর এই নতুন শক্তির ক্ষমতায়নের আলোচনায় জোটের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত, বিশেষ করে তুরস্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও সামরিক অবস্থানের কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। ন্যাটোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থায়ী সেনাবাহিনী নিয়ে আঙ্কারা এই পুরো অঞ্চলের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। বর্তমান ইরান সংকটে তুরস্কের এই সামরিক গুরুত্ব আমেরিকার জন্য কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

কৃষ্ণ সাগরে প্রবেশের নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ককেশাস অঞ্চলের থিয়েটারগুলোর ঠিক মাঝখানে তুরস্কের অবস্থান আঙ্কারাকে এক অনন্য ভূরাজনৈতিক শক্তি এনে দিয়েছে। যদি ন্যাটো কোনো কারণে আঙ্কারাকে নিজেদের থেকে দূরে ঠেলে দেয়, তবে তারা রাশিয়া এবং তার সহযোগী অক্ষের বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ঢাল হারিয়ে ফেলবে। তুরস্কের সামরিক শক্তি ছাড়া এই অঞ্চলে ন্যাটোর ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষমতা সম্পূর্ণ পঙ্গু হয়ে যাবে।

আমেরিকার চালানো ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শেষ পর্যন্ত ইরানকে আরও শক্তিশালী করবে নাকি তাদের চিরতরে দুর্বল করে দেবে, তা দেখার জন্য বিশ্বকে আরও অপেক্ষা করতে হবে। তবে ফলাফল যাই হোক না কেন, চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ইরানকে সবসময় তাদের পাশে ধরে রাখতে বাধ্য করবে। পুতিন এবং শি জিনপিং কখনোই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড তথা আইআরজিসির হাত ছেড়ে দেবে না।

পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো যখন এই ধরনের একটি সুসমন্বিত এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক হুমকির মুখোমুখি, তখন তাদের নিজেদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বন্ধ করা উচিত। আটলান্টিকের দুই পাড়ের দেশগুলোর মধ্যে যে পারস্পরিক ব্লেম-গেম বা দোষারোপের রাজনীতি চলছে, তা এই মুহূর্তে বন্ধ না করলে বিপর্যয় নেমে আসবে। ইরান সংকটের এই জটিল মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের এক হয়ে কাজ করা অত্যন্ত জরুরি।

সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটে এবং অনেক ইউরোপীয় দূরদর্শী নেতা খুব ভালোভাবেই বোঝেন যে বিশ্ব অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা রক্ষা করতে হলে যৌথ নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। ইতিহাস সাক্ষী, ন্যাটো হলো পৃথিবীর বুকে গড়ে ওঠা এ যাবৎকালের সবচেয়ে সফল, শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী সামরিক জোট। এই জোটের শক্তিকে দ্বিগুণ করার এবং পারস্পরিক বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার এখনই একমাত্র উপযুক্ত সময়।

আমেরিকার সাধারণ জনগণকেও এখন বুঝতে হবে যে বিশ্ব রাজনীতির এই পরিবর্তনের হাওয়া তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার ওপর কতটা গভীর প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুধুমাত্র দূরদেশের কোনো ঘটনা নয়, এর সাথে আমেরিকার প্রতিটি নাগরিকের দৈনিক তেলের দাম এবং শেয়ার বাজারের ভাগ্য জড়িত রয়েছে। ইউরোপের সাথে শক্তিশালী অংশীদারিত্বই পারে আমেরিকানদের এই অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে।

ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের জিডিপির বড় অংশ প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ করায় আমেরিকার ওপর থেকে বৈশ্বিক নিরাপত্তার একক অর্থনৈতিক বোঝা অনেকটাই কমে যাবে। ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপের সাথে একটি নতুন এবং অত্যন্ত সম্মানজনক কৌশলগত চুক্তি বা সমঝোতায় পৌঁছানো। ন্যাটোর সংস্কারের অর্থ এই নয় যে জোটকে ভেঙে ফেলা, বরং একে আরও আধুনিক করা।

চীন ও রাশিয়ার এই নতুন ব্লক যেভাবে এশিয়া থেকে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত নিজেদের জাল বিস্তার করছে, তা প্রতিরোধে একক কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য এবং ভৌগোলিক সুবিধার দিক থেকে ইউরোপ আমেরিকার এমন এক মিত্র যার কোনো বিকল্প এ পৃথিবীতে অন্য কোথাও নেই। তাই ট্রাম্পের উচিত ন্যাটোর হাতকে আরও শক্তিশালী করা এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

যদি ওয়াশিংটন অহংকারবশত ইউরোপের এই বন্ধুত্বের হাতকে প্রত্যাখ্যান করে, তবে তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্পূর্ণ একাকী এবং কোণঠাসা হয়ে পড়বে। এর ফলে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার যে দীর্ঘদিনের সামরিক ঘাঁটি ও প্রভাব রয়েছে, তা তাস খেলার ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। তাই ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেলের এই ঐতিহাসিক প্রস্তাব আমেরিকার জন্য একটি লাইফলাইন বা বেঁচে থাকার শেষ সুযোগ।

শেষে বলা যায়, বিশ্ব এক অত্যন্ত নাজুক ও বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। আমেরিকা ও ইউরোপের এই ঐতিহাসিক পুনর্মিলনই কেবল পারে বিশ্বমঞ্চে স্বৈরাচারী অক্ষের উত্থানকে রুখে দিতে এবং বৈশ্বিক শান্তি বজায় রাখতে। ট্রাম্প রুটের এই বাড়িয়ে দেওয়া হাতটি ধরবেন কি না, তার ওপরেই নির্ভর করছে আগামী পৃথিবীর রূপরেখা।

আপনারা কী মনে করেন? ডোনাল্ড ট্রাম্প কি শেষ পর্যন্ত ন্যাটোর এই প্রস্তাব মেনে নিয়ে ইউরোপের সাথে হাত মেলাবেন? নাকি নিজের অহংকার ধরে রেখে আমেরিকাকে আরও বড় সংকটের মুখে ঠেলে দেবেন?

Walton Ads