লেবাননে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে দেশজুড়ে দেখা গেছে লাশের মিছিল আর হাহাকার। ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৬০০–এর বেশি মানুষ নিহত এবং সাড়ে সাত লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং গাজায় ব্যবহৃত সেই পরিচিত ‘ধ্বংস, উচ্ছেদ ও বিভাজন’ কৌশলেরই নতুন সংস্করণ এখন লেবাননে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
এই কৌশলের ছকটিও বেশ পরিচিত— প্রথমে মানুষকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ বা হুমকি দেওয়া, এরপর বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে ‘বাফার জোন’ তৈরি করা, এবং সবশেষে পুরো অঞ্চলকে ছোট ছোট খণ্ডে ভাগ করে দেওয়া, যাতে সেখানে কোনো শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠতে না পারে।
গাজা থেকে লেবানন—একই কৌশল
ফিলিস্তিনে তিন বছর কাজ করার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মী জোনাথন হুইটল বলেছেন, এই ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
আল-জাজিরায় প্রকাশিত তার বিশ্লেষণে বলা হয়, পশ্চিম তীরে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে রেখেছে। কখনও পানির কূপে সিমেন্ট ঢেলে দেওয়া, আবার কখনও অনুমতি নেই—এই অজুহাতে ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
গাজায় একই কৌশল আরও দ্রুত এবং ভয়াবহভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের গাজা যুদ্ধের কৌশল
২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ঘোষণা দেয়— গাজার উত্তরাঞ্চলের সবাইকে এলাকা ছাড়তে হবে। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয় ‘সম্পূর্ণ অবরোধ’।
খাবার নেই, পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই— এমন পরিস্থিতি তৈরি করে পুরো জনগোষ্ঠীকে কার্যত শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এরপর গাজাকে বিভিন্ন ব্লকে ভাগ করে একটি ম্যাপ প্রকাশ করা হয়। যখন কোনো ব্লকের নম্বর ঘোষণা করা হতো, তখন সেই এলাকার বাসিন্দাদের ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হতো।
মানুষকে বলা হয়েছিল ‘আল-মাওয়াসি’ নামের একটি সৈকতে আশ্রয় নিতে, যাকে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেখানেও বিমান হামলা চলতে থাকে।
এভাবে ধীরে ধীরে এলাকাগুলো খালি করে ধ্বংস করা হয়।
লেবাননেও একই চিত্র
বর্তমানে লেবাননেও প্রায় একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। মানুষকে এলাকা ছাড়তে বলা হচ্ছে, অবকাঠামো ধ্বংস করা হচ্ছে এবং অনেক জায়গা কার্যত জনশূন্য হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলের তিনটি মূল স্তম্ভ হলো— ধ্বংস করা, উচ্ছেদ করা এবং বিভাজন সৃষ্টি করা।
লক্ষ্য এলাকা শান্ত করা নয়, বরং তা খালি করে দেওয়া।
বদলে গেছে ইসরায়েলের লক্ষ্য
১৯৮০–এর দশকের যুদ্ধে ইসরায়েল লেবাননে নিজেদের পছন্দের সরকার বসাতে চেয়েছিল।
কিন্তু গাজা যুদ্ধের পর সেই লক্ষ্য বদলে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন তাদের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট সরকারকে ক্ষমতায় আনা নয়, বরং কার্যকর সরকারই যাতে না থাকে তা নিশ্চিত করা।
এর ফলে অঞ্চলটি ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং কোনো শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ গড়ে উঠবে না।
লেবানন গাজার মতো নয়
তবে বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননের বাস্তবতা গাজার মতো নয়।
হামাস একটি অবরুদ্ধ সরু এলাকায় সীমিত অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু হিজবুল্লাহর কাছে রয়েছে উন্নত অস্ত্র, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধপ্রস্তুতি।
দক্ষিণ লেবানন ও বেকা উপত্যকায় ইসরায়েলি স্থল অভিযান ইতোমধ্যেই শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়েছে।
এদিকে ইরানও লেবাননের পরিস্থিতিকে যেকোনো যুদ্ধবিরতির আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা
এই সংঘাত ইতোমধ্যে ১৪তম দিনে গড়িয়েছে। সিএনএন-এর হিসাব অনুযায়ী, বেসামরিক নাগরিক ও সামরিক সদস্য মিলিয়ে ২০০০–এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরানে ১৩০০–এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা Human Rights Activists News Agency (HRANA) বলছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
শুক্রবারের হিসাব অনুযায়ী বেসামরিক ও সামরিক মিলিয়ে কমপক্ষে ১৮৫৮ জন নিহত হয়েছেন।
লেবাননে হতাহতের চিত্র
নিহতের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে লেবানন। দেশটির জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে সেখানে কমপক্ষে ৭৭৩ জন নিহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে ১০৩ জনই শিশু।
এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে এই সংঘাতে প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে—
১৫ জন ইসরায়েলি, ১৩ জন মার্কিন পরিষেবা সদস্য, ৩২ জন ইরাকি, শিশুসহ ৬ কুয়েতি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাকিস্তানি, নেপালি ও বাংলাদেশিসহ ৬ জন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া বাহরাইনে ১ জন, ওমানে ৩ জন এবং সৌদি আরবে ২ জন নিহত হয়েছেন।
শান্তির পথ কোথায়
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে শুধু যুদ্ধবিরতি যথেষ্ট নয়।
এর জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর প্রয়োগ, দায়ীদের বিচার এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করা— তা গাজা থেকে বৈরুত পর্যন্ত যেখানেই হোক না কেন।
