বিশ্ব বাণিজ্যের জীবনরেখা খ্যাত হরমুজ প্রণালি এখন যেন আগুনের গোলায় পরিণত হয়েছে। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এই কৌশলগত জলপথটি সচল রাখতে মিত্র দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর জন্য জরুরি আহ্বান জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ট্রাম্পের সেই ডাকে সাড়া মেলেনি বললেই চলে। তেলের বাজারে অস্থিরতা আর যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা মাথায় রেখে চীন, ফ্রান্স, জাপানসহ অধিকাংশ দেশই এই মুহূর্তে 'নীরবতা' পালনের কৌশল নিয়েছে।

আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ট্রাম্পের এই সামরিক জোট গঠনের চেষ্টা কেন সফলতার মুখ দেখছে না। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ট্রাম্প স্পষ্ট লিখেছিলেন, "চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ব্রিটেনকে দ্রুত ওই এলাকায় যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে হবে। ইরান এখন চরম বিপর্যয়ের মুখে, তাই হরমুজ প্রণালি আর হুমকির কারণ হওয়া উচিত নয়।"

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট আশাবাদী হলেও, মিত্র দেশগুলোর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট আশ্বাস মেলেনি। বরং ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বিশ্ব তেলের এক-পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে যায়, সেই হরমুজ প্রণালি কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলপন্থী দেশগুলোর জন্যই বন্ধ। বাকি সবার জন্য এটি উন্মুক্ত থাকবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, অনেক দেশই তাদের জাহাজের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। আর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ইরানের সেনাবাহিনী। এই অবস্থার সুবিধা নিয়েছে ভারত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানান, তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পর গত শনিবার ভারতের দুটি গ্যাস ট্যাংকার নিরাপদে ওই পথ পেরিয়ে এসেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন এই মিশনে যোগ না দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ ইরানের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্কের কারণে চীনের তেলের জাহাজগুলো কোনো বাধা ছাড়াই চলাচল করছে। ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক মিশনের মাধ্যমে জাহাজ পাহারা দেওয়ার বিষয়টি ভাবছে, তবে যুদ্ধ থামার পর। আর জার্মানি তো সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই যুদ্ধের অংশ হতে চায় না।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে— ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের জবাবে তেহরানের বিপ্লবী গার্ডের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নাইনি বলেছেন, "ট্রাম্প যদি মনে করেন ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে সাহস থাকলে তিনি যেন নিজের জাহাজ পারস্য উপসাগরে পাঠান।"

তিনি আরও হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০০টি মিসাইল নিক্ষেপ করেছে, যার অধিকাংশই পুরোনো। তাদের অস্ত্রভাণ্ডার এখনও অক্ষত রয়েছে এবং নতুন মিসাইলের ব্যবহার এখনও শুরুই হয়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ১০টি তেলের ট্যাংকারে হামলার খবর পাওয়া গেছে এবং বর্তমানে প্রায় এক হাজার তেলের ট্যাংকার হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়ে আছে। ফলে তেলের দাম ইতোমধ্যে ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা।

 

news