বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। দেশটির ক্ষমতাসীন ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যদি প্রণালির ওমান অংশ দিয়ে চলাচল করে, তাহলে সেগুলোর ওপর কোনো হামলা চালাবে না ইরান।

তবে এই প্রস্তাবের সঙ্গে রয়েছে স্পষ্ট শর্ত। ইরানি সূত্রের দাবি, ওয়াশিংটন যদি তেহরানের দাবিগুলো মেনে নিতে প্রস্তুত থাকে, তাহলেই এই প্রস্তাব কার্যকর করা সম্ভব হবে।

১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরকে যুক্ত করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের উত্তর উপকূলে রয়েছে ইরান, আর দক্ষিণে রয়েছে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য এই প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, বিশ্বজুড়ে সরবরাহ হওয়া মোট জ্বালানির প্রায় এক-চতুর্থাংশই এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের জন্য এর গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ এই তিন দেশের জ্বালানির প্রায় ৮০ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। শুধু জ্বালানি নয়, সার, রাসায়নিকসহ নানা পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করে। ফলে তেলবাহী জাহাজগুলো এখন বাধ্য হয়ে ঘুরপথে চলাচল করছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। অনেক দেশেই তেলের দাম বেড়েছে, দেখা দিয়েছে সরবরাহ সংকট।

অবরোধের কারণে হরমুজে আটকা পড়েছে শত শত জাহাজ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কয়েক শ’ জাহাজ ও ২ হাজারের বেশি নাবিক সেখানে আটকে রয়েছেন।

এদিকে হরমুজ প্রণালিকে আবারও উন্মুক্ত করার দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে। গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকেও হরমুজে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনার বিষয়টি ছিল অন্যতম প্রধান আলোচ্য।

তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, হরমুজ পুরোপুরি খুলে দেওয়া ইরানের জন্য সহজ নয়। কারণ যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের অভিজাত প্রতিরক্ষা বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) প্রণালির বিভিন্ন স্থানে জলমাইন পেতে রেখেছে। কিন্তু ঠিক কোথায় কোথায় মাইন বসানো হয়েছে, সেটি এখন নিজেরাই শনাক্ত করতে পারছে না তারা।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, আইআরজিসি মাইন বসানোর জায়গাগুলো সঠিকভাবে নথিভুক্ত করেনি।

ইতোমধ্যে হরমুজ থেকে মাইন সরাতে কাজ শুরু করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনী। এর অংশ হিসেবে ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোতে অবরোধ জারি করা হয়েছে। ফলে ইরানের কোনো বন্দর থেকে জাহাজ বের হতে পারছে না, আবার বিদেশি জাহাজও প্রবেশ করতে পারছে না।

মাইন অপসারণে ইরান সহযোগিতা করবে কি না— এ বিষয়ে রয়টার্স ইরানের সরকারি সূত্রের কাছে জানতে চাইলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে জানা গেছে, ইরানের এই নতুন প্রস্তাব ইতোমধ্যে হোয়াইট হাউসে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউসে যোগাযোগ করা হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

 

news