দীর্ঘদিনের সংঘাতের পর এখন কার্যত একটাই পথ খোলা রয়েছে—সমঝোতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশই বুঝতে পারছে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোই এখন বাস্তবসম্মত সমাধান। যুদ্ধবিরতির শেষ দিকের দিনগুলোতে এই অঘোষিত বাস্তবতা আরও পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।
ইসলামাবাদ-এ প্রথম দফার দীর্ঘ আলোচনাকে অনেক বিশ্লেষক কৌশলগত শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখছেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চেয়েছে বলেই ধারণা। আলোচনার পরপরই ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করা হয়, যা আগেই পরিকল্পিত ছিল বলে মনে করা হচ্ছে। এই অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর না হলেও আংশিক প্রভাবেই ইরানের অর্থনীতিতে বড় চাপ পড়তে পারে—বিশেষ করে তেলনির্ভর দেশগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়বে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই একটি চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এর পেছনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ চাপ—যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং তার সমর্থকদের অসন্তোষ। সব মিলিয়ে দ্রুত একটি কূটনৈতিক সাফল্য তার জন্য এখন জরুরি।
ট্রাম্পের আলোচনার ধরন অনেকটাই অনির্দেশ্য। কখনো কঠোর, কখনো নরম—এই পরিবর্তনশীল কৌশল প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতে ঝুঁকিও আছে। কখনো কখনো এটি দুর্বলতা বা অস্থিরতার বার্তা দিতেও পারে।
অন্যদিকে, ইরান বাইরে থেকে শক্ত অবস্থান দেখালেও ভেতরে ভেতরে কঠিন পরিস্থিতির মুখে রয়েছে। টানা ৩৯ দিনের বোমাবর্ষণে তাদের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো বড় ধাক্কা খেয়েছে। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-র নেতৃত্বাধীন শাসনব্যবস্থাও এখন পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জে রয়েছে। আইআরজিসি-এর নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে, যা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সবকিছুর পরও ইরান টিকে আছে—এটাই তাদের বড় বার্তা। যদিও এই শক্তি সরাসরি সামরিক বিজয় থেকে নয়, বরং দীর্ঘ সময় সহ্য করার ক্ষমতা থেকে এসেছে। আঞ্চলিকভাবে এখন তারা কিছুটা দুর্বল অবস্থানে, এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও খারাপ হয়েছে।
ইরান ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের সঙ্গে উত্তেজনায় জড়িয়েছে। ইরাক আংশিক নিরপেক্ষ থাকলেও বিভক্ত অবস্থানে আছে। পাকিস্তান মধ্যস্থতা করছে, তবে সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের প্রতিরক্ষা চুক্তি ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ফলে ইরানের জন্য আঞ্চলিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
তবে আলোচনায় কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও হয়েছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার বিষয়ে দুই পক্ষই একমত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সহায়ক হবে।
পারমাণবিক ইস্যুতেও সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইরান পাঁচ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখতে আগ্রহী, আর যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ২০ বছরের বিরতি। আলোচনার মাধ্যমে মাঝামাঝি কোনো সমাধানে পৌঁছানো যেতে পারে।
ইরানের কাছে থাকা ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তবে এটি দ্রুত অস্ত্রে রূপান্তর করা সম্ভব নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—যেমন মজুত স্থানান্তর, কম মাত্রায় নামিয়ে আনা বা সরাসরি পর্যবেক্ষণ।
এই পুরো পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হয়ে আছে ইসরায়েল। ইরান চায় তাদের মিত্র, বিশেষ করে হিজবুল্লাহ-এর ওপর হামলা বন্ধ হোক। কিন্তু ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আপস করতে রাজি নয়। লেবাননে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ এবং বৈরুতে হামলা উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দুই পক্ষই এমন একটি চুক্তি চায়, যা নিজেদের জনগণের কাছে ‘জয়’ হিসেবে তুলে ধরা যাবে। যুক্তরাষ্ট্র চাইবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে দীর্ঘমেয়াদে সীমিত করতে এবং এটিকে ২০১৫ সালে বারাক ওবামা-র সময়ের চুক্তির চেয়েও শক্তিশালী হিসেবে দেখাতে। অন্যদিকে, ইরান চায় তাদের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরোধ ক্ষমতা অটুট রয়েছে—এই বার্তাই দিতে।
