অন্ধকারে নিমজ্জিত পশ্চিম এশিয়া। আকাশজুড়ে বারুদের গন্ধ আর ড্রোন-মিসাইলের কানফাটানো আওয়াজ। গত দেড় মাস ধরে যা চলছে, তাকে কেবল যুদ্ধ বললে ভুল হবে—এটি যেন এক মহাপ্রলয়ের সংকেত। একদিকে আধুনিক সভ্যতার দাবিদার আমেরিকা, অন্যদিকে হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারক পারস্য বা আজকের ইরান। এই দুই শক্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক রহস্যময় খেলোয়াড়—বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন লেবানন আর ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিচ্ছেন, যখন হোয়াইট হাউসের লনে দাঁড়িয়ে তিনি বলছেন "শান্তি আসন্ন", ঠিক তখনই তেল আবিবের ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টারে লেখা হচ্ছে অন্য এক ইতিহাস। সমর বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। প্রশ্ন একটাই—ট্রাম্প কি শান্তি আনছেন, নাকি তাকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে নেতানিয়াহু তার 'গ্রেটার ইজ়রায়েল' বা বৃহত্তর ইসরায়েলের স্বপ্ন পূরণ করছেন?

আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব সেই নেপথ্য কারণগুলো, যা মূলধারার সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে না। কেন পাহাড়ের গভীর সুড়ঙ্গে পারমাণবিক গবেষণা চালাচ্ছে ইরান? কেন ট্রাম্পের পাঠানো 'বাঙ্কার বাস্টার' বোমা আজ বিশ্বের জন্য আতঙ্ক? আর কেনই বা শান্তির আলোচনার মাঝপথে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বাড়াল ইজ়রায়েল? চলুন, রহস্যের গভীরে প্রবেশ করি।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, চলতি ২০২৬ সালের শুরু থেকেই নেতানিয়াহু এক অদ্ভূত রণনীতি গ্রহণ করেছেন। তিনি জানেন, ইরানের মতো বিশাল সামরিক শক্তির সাথে একা লড়াই করা ইজ়রায়েলের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। তাই তিনি বেছে নিয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র আমেরিকাকে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে তার ব্যক্তিগত সুসম্পর্ককে পুঁজি করে তিনি ওয়াশিংটনকে এই যুদ্ধে সরাসরি টেনে নামিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা একে বলছেন "ট্রাম্পের ঘাড়ে বন্দুক রেখে শত্রু খতম করা"। ট্রাম্পের লক্ষ্য যেখানে ছিল দ্রুত যুদ্ধ শেষ করে আমেরিকার অর্থনীতি বাঁচানো, সেখানে নেতানিয়াহুর লক্ষ্য হলো—এই সুযোগে আরব দুনিয়ার শক্তিশালী শত্রুদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করা। হিজবুল্লাহর সামরিক কাঠামো ধ্বংস করা এবং ইরানের পারমাণবিক স্বপ্ন ধূলিসাৎ করা—এই দুই লক্ষ্য পূরণে তিনি ট্রাম্পকে একরকম বাধ্য করেছেন।

নেতানিয়াহুর ওপর ট্রাম্প কতটা আস্থা রাখতে পারেন, তা নিয়ে খোদ পেন্টাগনের ভেতরেই বিতর্ক আছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যখন হামাসের সাথে সংঘর্ষবিরতি হয়েছিল, বিশ্ব ভেবেছিল রক্তপাত থামবে। কিন্তু ইজ়রায়েলি ফৌজ সেই চুক্তির তোয়াক্কা না করে গাজায় চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়েই গেছে। এই যে 'বিশ্বাসভঙ্গ', এটিই এখন ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পারস্যে শান্তি আনতে গিয়ে যদি আবার নেতানিয়াহুর হাতে ধোঁকা খেতে হয়, তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আমেরিকার মর্যাদা ধূলিসাৎ হবে।

ইরানের ভূখণ্ড সাধারণ কোনো যুদ্ধের ময়দান নয়। পারস্যের প্রতিরক্ষা গবেষকরা বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ের গভীরে, মাটির কয়েকশ ফুট নিচে তৈরি করেছেন তাদের পারমাণবিক ল্যাবরেটরি। ২০২৫ সালের জুনে যখন ইজ়রায়েল প্রথমবার বিমান হামলা চালায়, তারা অবাক হয়ে দেখে যে সাধারণ মিসাইল এই পাহাড়ের কোনো ক্ষতিই করতে পারছে না।

সেখানে হাজার হাজার টন কনক্রিট আর স্টিলের বর্ম দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণের কাজ। ইরানের আইআরজিসি (IRGC) বা রেভল্যুশনারি গার্ড কোর জানে, যদি একবার তারা পারমাণবিক বোমা বা 'ব্রহ্মাস্ত্র' তৈরি করে ফেলতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের পুরো সমীকরণ বদলে যাবে। আর এই ভয়টাই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে নেতানিয়াহুকে।

যখন সাধারণ হামলায় কাজ হলো না, তখন আসরে নামল আমেরিকা। ট্রাম্পের নির্দেশে মোতায়েন করা হলো বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমান। এই বিমানটি রাডারে ধরা পড়ে না। আর এটি বহন করে নিয়ে এল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নন-নিউক্লিয়ার বোমা— জিবিইউ-৫৭ বা 'ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর' (MOP)।

এটি এমন এক দানবীয় বোমা যা কয়েকশ ফুট গভীর শক্ত পাথর ভেদ করে ভেতরে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। ইরানের সেই সুরক্ষিত বাঙ্কারগুলো ধ্বংস করতেই এই মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ট্রাম্প একে বলছেন 'অপারেশন ডার্ক নাইট', কিন্তু ইরান একে দেখছে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে।

ইরান যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, তখনই নেতানিয়াহু তার নজর ফেরালেন বেইরুটের দিকে। হিজবুল্লাহকে বলা হয় ইরানের 'প্রক্সি' বা ছায়া সেনাবাহিনী। নেতানিয়াহুর অভিযোগ, তেহরান থেকেই সব রসদ আসে হিজবুল্লাহর কাছে। তাই ইরান যখন নিজের ঘর সামলাতে ব্যস্ত, তখনই লেবাননের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ইজ়রায়েলি বিমানবাহিনী।

১০ দিনের যে যুদ্ধবিরতির কথা ট্রাম্প বলছেন, সেটি কি হিজবুল্লাহর জন্য স্বস্তির? সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিরতি মূলত হিজবুল্লাহকে নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ দিচ্ছে। আর ঠিক এই কারণেই নেতানিয়াহু এই চুক্তিতে মন থেকে সায় দেননি। তিনি জানেন, সাপকে আধমরা করে রাখা বিপজ্জনক।

এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যখন তেহরান এবং ওয়াশিংটন মুখোমুখি বসল, সারা বিশ্বের চোখ ছিল সেখানে। পাকিস্তান এখানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছিল। কিন্তু আলোচনা চলাকালীনই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খওয়াজা আসিফের এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট সব লন্ডভন্ড করে দিল। তিনি ইজ়রায়েলকে 'ক্যানসার রাষ্ট্র' বলে অভিহিত করলেন।

ইজ়রায়েল এই মন্তব্যকে ইস্যু করে আলোচনার টেবিল থেকে সরে যাওয়ার বাহানা খুঁজল। অন্যদিকে, বৈঠক চলাকালীনই বেইরুটে হামলা চালিয়ে নেতানিয়াহু বুঝিয়ে দিলেন—তিনি কোনো শান্তিচুক্তির তোয়াক্কা করেন না। ট্রাম্প যখন ইসলামাবাদের সফলতার কথা বলছেন, তখন মাঠের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

নেতানিয়াহুর এই রণমূর্তি কি কেবল আত্মরক্ষার জন্য? অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এর পেছনে রয়েছে এক প্রাচীন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বপ্ন—'গ্রেটার ইজ়রায়েল'। নীল নদ থেকে দজলা-ফোরাত পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা। আর এই স্বপ্ন পূরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ইরান। তাই ইরানকে দুর্বল করা মানেই সেই স্বপ্নের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। এই ষড়যন্ত্রের জালে ট্রাম্প কি জেনেশুনি পা দিয়েছেন, নাকি তিনিও এর অংশীদার?

ইরান কেবল মার খাওয়ার দেশ নয়। ২৮শে ফেব্রুয়ারি যখন যৌথ হামলা হলো, তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো আগুনের গোলার মতো জ্বলতে শুরু করল। ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি আজ বিশ্বকে অবাক করে দিচ্ছে। রাশিয়ার সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতা এবং ড্রোন সরবরাহের অভিজ্ঞতা তারা এই যুদ্ধে কাজে লাগিয়েছে।

ট্রাম্প দাবি করছেন ইরান তাদের সব ইউরেনিয়াম আমেরিকার হাতে দিয়ে দেবে। কিন্তু ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফের ঘনিষ্ঠ মহল থেকে খবর আসছে সম্পূর্ণ উল্টো। তারা বলছে, "আমাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সম্পদ আমরা শত্রুর হাতে তুলে দেব না।" ইরান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ট্রাম্পের দাবিকে উপহাস করছে।

এখানেই তৈরি হয়েছে এক বড় ধোঁয়াশা। ট্রাম্প কি মিথ্যা বলছেন নিজের দেশে জনপ্রিয়তা পেতে? নাকি ইরান গোপনে কোনো বড় ডিল করছে যা বিশ্ব জানে না? তবে ইরানের শিয়া মুলুক যেভাবে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে তারা একটি পারমাণবিক শক্তির রাষ্ট্র হওয়ার পথ থেকে এক ইঞ্চিও সরবে না।

এই পুরো যুদ্ধে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো বড় বড় আরব রাষ্ট্রগুলোর নীরবতা। সৌদি আরব, কাতার বা সংযুক্ত আরব আমিরাত—কেউই সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। তারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। একদিকে ইরানের আধিপত্যের ভয়, অন্যদিকে ইজ়রায়েলের সাথে ক্রমবর্ধমান ব্যবসায়িক সম্পর্ক। এই দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতে গিয়ে তারা কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে? ১৬ই এপ্রিল নেভাদা আর অ্যারিজোনা সফরে যাওয়ার আগে ট্রাম্প যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাতে মনে হচ্ছে তিনি ইরানের সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে মরিয়া। তিনি আগামী দুই মাসের মধ্যে একটি স্থায়ী সমাধান চান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নেতানিয়াহু কি তা হতে দেবেন?

ইজ়রায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন নেতানিয়াহু তুঙ্গে। যুদ্ধের উন্মাদনা তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি জানেন, যুদ্ধ থামলে তাকে হয়তো দুর্নীতির মামলায় জেলে যেতে হতে পারে। তাই নিজের অস্তিত্ব বাঁচাতে তিনি এই যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে চাইবেন। ট্রাম্পের শান্তি প্রক্রিয়ায় জল ঢেলে দেওয়া তার জন্য নতুন কিছু নয়।

পারস্যের আকাশে এখন যে স্তব্ধতা, তা কি বড় কোনো ঝড়ের সংকেত? ইউরেনিয়াম কি আসলেই পাহাড়ি সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসবে? নাকি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র রক্ত দিয়ে আবার নতুন করে লেখা হবে? সময় এর উত্তর দেবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই লড়াইয়ে কেউ কাউকে এক চুল জমিও ছাড়বে না। 

আপনাদের কী মনে হয়? ট্রাম্প কি পারবেন নেতানিয়াহুকে থামিয়ে পারস্যে স্থায়ী শান্তি আনতে? নাকি নেতানিয়াহুর 'গ্রেটার ইজ়রায়েল' মিশন বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে? কমেন্টে আপনার মূল্যবান মতামত জানান।

news