বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হলো। দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা অংশীদার রাশিয়া আর ভারত চূড়ান্ত করে ফেলল এখন পর্যন্ত করা সবচেয়ে বড় লজিস্টিক চুক্তিগুলোর একটি। নাম দেওয়া হয়েছে ‘রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অব লজিস্টিকস সাপোর্ট’ বা সংক্ষেপে ‘রেলোস’।

এই চুক্তির জোরেই এখন এক দেশের সেনা, যুদ্ধজাহাজ আর সামরিক বিমান অন্য দেশের ভূখণ্ডে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করতে পারবে। বিষয়টা অনেকটা বন্ধুর বাড়িতে ওঠার মতো—যখন দরকার, তখন ব্যবহার করা যায় সুযোগ-সুবিধা।

ভারতের বড় নীতিগত পরিবর্তন

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা ভারতের জন্য একটা বড় মোড়। কারণ প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশি সামরিক বাহিনীকে নিজের মাটিতে থাকার অনুমতি দিল দেশটি। যদিও তা সীমিত সময়ের জন্য।

প্রায় ৮ বছর ধরে আলোচনার পর অবশেষে গত বছর, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মস্কোতে চুক্তিতে সই হয়। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অনুমোদন দেন ১৫ ডিসেম্বর। আর গত ১২ জানুয়ারি থেকে চুক্তিটি কার্যকর হয়েছে।

কতদিন থাকবে? কত সেনা আসবে?

আপাতত মেয়াদ পাঁচ বছর। চাইলে দুই পক্ষে আরও বাড়ানো যাবে।

এই চুক্তির আওতায় রাশিয়া বা ভারত—উভয় দেশই একে অন্যের দেশে সর্বোচ্চ ৩ হাজার সেনা, ৫টি যুদ্ধজাহাজ এবং ১০টি সামরিক বিমান মোতায়েন করতে পারবে। এ ছাড়া জাহাজের জন্য বন্দর ব্যবহার, জ্বালানি, মেরামত আর রসদের ব্যবস্থাও থাকছে। বিমানের জন্য বিমানবন্দর, কন্ট্রোল সিস্টেম, জ্বালানি আর রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধাও মিলবে। একই সঙ্গে দুর্যোগ ও মানবিক সাহায্যে যৌথভাবে কাজ করাও সহজ হবে।

রাশিয়া কি পাচ্ছে?

রাশিয়া বহু দশক ধরে ভারতের অস্ত্র সরবরাহকারী। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় বেশ চাপে আছে মস্কো। তাই নতুন অংশীদারিত্ব বাড়ানো এখন তাদের জরুরি প্রয়োজন।

এই চুক্তি রাশিয়াকে ভারত মহাসাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার দিয়ে দিল। আর তাতে তারা অনেক দিন নৌ আর বিমান মোতায়েন রাখতে পারবে। এশিয়ায় তাদের কৌশলগত উপস্থিতিও বাড়বে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি রাশিয়ার জন্য ‘লজিস্টিক ব্রিজ’।

ভারতের লাভ কী?

ভারতের জন্যও এর সুবিধা কম নয়। এই চুক্তির ফলে ভারত রাশিয়ার আর্কটিক ও দূরপ্রাচ্যের বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। সেইসঙ্গে উত্তর সমুদ্রপথে প্রবেশের সুযোগ পাবে দেশটি। পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত লজিস্টিক নেটওয়ার্কের বাইরে ভারতের জন্য এটা একটা বিকল্প রাস্তা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ভারতের সামরিক কৌশল আরও নমনীয় ও বহুমুখী হবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের অবস্থানও মজবুত করতে পারবে তারা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী বলবে?

ভারতের আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘লেমোয়া’ নামে একধরনের লজিস্টিক চুক্তি আছে, যা সই হয় ২০১৬ সালে। ওই চুক্তিতে দুই দেশের ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে ‘রেলোস’ চুক্তিটা একটু আলাদা। কারণ এখানে রাশিয়াকে সীমিত হলেও সেনা এবং যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে—যেটা অন্য কোনো চুক্তিতে নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ভারতের বার্তা হচ্ছে—আমরা আমাদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখতে চাই।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি?

শেষ পর্যন্ত ‘রেলোস’ চুক্তি রাশিয়া আর ভারতের পুরনো প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও গভীর করল। এটা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাশাপাশি ভারত একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার সঙ্গেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কৌশল নিয়েছে। তবে বিষয়টা কোনো সামরিক জোট নয়; বরং একে বলা হচ্ছে ‘লজিস্টিক ও কৌশলগত সহযোগিতার কাঠামো’, যা আগামী দিনে দুই দেশের সামরিক সক্ষমতা আর বৈশ্বিক উপস্থিতি অনেক বাড়িয়ে দেবে।

 

news