জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) পর্যালোচনা সম্মেলনে ইরানকে অন্যতম সহ-সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডা তৈরি হয়, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক চাপকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

সোমবার শুরু হওয়া চার সপ্তাহব্যাপী এই সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ৩৪ জন সহ-সভাপতির একজন হিসেবে ইরান নির্বাচিত হওয়ার পর মার্কিন প্রতিনিধি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

১২১টি উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধিত্বকারী জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM) ইরানকে এই পদে মনোনয়ন দেয়। তারা পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির সার্বভৌম অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেয়।

ইরানের নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে মার্কিন দূত দাবি করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন “গভীরভাবে বিস্মিত” যে এমন একটি দেশকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে চুক্তির প্রতি অবজ্ঞার অভিযোগ রয়েছে।

ওয়াশিংটনের কিছু মিত্র দেশ—যেমন অস্ট্রেলিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—একই ধরনের আপত্তি তোলে। অন্যদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি বিষয়টি নিয়ে “উদ্বেগ” প্রকাশ করে। তবে রাশিয়া স্পষ্টভাবে ইরানকে আলাদা করে টার্গেট করার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে।

ভিয়েনায় জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা নাজাফি মার্কিন অভিযোগগুলোকে “ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে উড়িয়ে দেন।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী নীতির কড়া সমালোচনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ যারা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে। তারা এখনো নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াচ্ছে এবং পশ্চিম এশিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল বানানোর পথে বাধা দিচ্ছে—বিশেষ করে ইসরায়েলের অঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারকে রক্ষা করে।

নাজাফি আরও বলেন, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণ ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিক্রিয়া কূটনৈতিক চাপ ও আগ্রাসনেরই অংশ, যেখানে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক পদক্ষেপ এবং এনপিটি’র অধীনে ইরানের অধিকার সীমিত করার চেষ্টা রয়েছে।

স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মতে, মার্কিন অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মতামত মানতে অস্বীকৃতির আরেকটি উদাহরণ, যেখানে ইরানকে একজন দায়িত্বশীল এনপিটি সদস্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং পশ্চিম এশিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের কারণে এই উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ তেহরানের।

তীব্র আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও ইরান এনপিটি’র প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার রক্ষায় দৃঢ় অবস্থানে আছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সহ-সভাপতি নির্বাচিত হওয়া বহুপাক্ষিক কূটনীতির একটি বড় জয় এবং একই সঙ্গে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা।

 

news