আরব সাগরের উত্তপ্ত জলসীমায় আবারও ইরানের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের একটি ড্রোনকে গুলি করে ভূপাতিত করেছে মার্কিন যুদ্ধবিমান। মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্টকম (সেন্ট্রাল কমান্ড) এই ঘটনার ঘোষণা দিয়েছে। এই ঘটনা সত্ত্বেও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা এখনও চলছে, আর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও ন্যায্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
ট্রাম্প মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চললেও, কবে কোথায় হচ্ছে তা প্রকাশ করতে চাননি তিনি। তিনি বলেন, "কিছুক্ষণ আগেও তাদের (ইরানের) কিছু করার সুযোগ ছিল, কিন্তু সেটা কাজে লাগেনি। আর আমরা 'মিডনাইট হ্যামার' করেছি, আমি মনে করি না তারা আবার সেই অবস্থা চায়।" তিনি গত জুনে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার কথা উল্লেখ করেন, যেটিকে অপারেশন 'মিডনাইট হ্যামার' বলা হয়।
ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন এবং দেশটির সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের কারণে সামরিক হামলার হুমকিও দিয়েছেন। গত সপ্তাহে তিনি আরব সাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন পাঠান, যার ফলে পুনরায় সামরিক সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
এদিকে, মঙ্গলবারই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে মর্যাদা, বিচক্ষণতা ও জাতীয় স্বার্থের আলোকে ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
ড্রোন ভূপাতিতের ঘটনা:
সেন্ট্রাল কমান্ডের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নিরাপত্তায় থাকা একটি মার্কিন এফ/এ-১৮ যুদ্ধবিমান ইরানের একটি 'শাহেদ-১৩৯' ড্রোনকে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে গুলি করে ভূপাতিত করে। ইরানের দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় ৫০০ মাইল দূরে অবস্থানকালে ড্রোনটি 'আক্রমণাত্মকভাবে' রণতরীর দিকে এগিয়ে আসছিল এবং এর উদ্দেশ্য 'অস্পষ্ট' ছিল। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক জলসীমায় উত্তেজনা কমানোর সকল চেষ্টা সত্ত্বেও ড্রোনটি জাহাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় তাদের একটি ড্রোনের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, যেটি ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কাছে তথ্য পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল। কেন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো, তা নিয়ে তদন্ত চলছে।
এই ঘটনার পর, মার্কিন কমান্ড জানায়, আইআরজিসি বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে একটি মার্কিন পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজকেও হয়রানি করেছে। দুইটি আইআরজিসি দ্রুতগামী নৌকা ও একটি ইরানি 'মোহাজের' ড্রোন 'এম/ভি স্টেনা ইম্পেরাটিভ' জাহাজটির কাছে এসে এটিকে আটক করার হুমকি দেয়। তবে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে দাবি করা হয়, ওই জাহাজ প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই ইরানের জলসীমায় প্রবেশ করেছিল এবং সতর্ক করার পর সেটি নিরাপদে সেখান থেকে চলে যায়।
আলোচনার ভবিষ্যৎ:
এই উত্তেজনা সত্ত্বেও, আলোচনার সম্ভাবনা এখনও উজ্জ্বল আছে বলে মনে হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এই সপ্তাহের শেষেই ইরানের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করবেন। আলোচনার স্থান নির্ধারণ নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে, তুরস্ক ও ওমানসহ বেশ কয়েকটি দেশ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে খবর আছে, ইরান আলোচনা ওমানে করতে চাচ্ছে এবং শুধুমাত্র পারমাণবিক ইস্যুতেই আলোচনা সীমিত রাখতে চাইছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা করতে চায়।
বিশ্লেষকরা অবশ্য এই আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সন্দিহান। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেছেন, "প্রশ্ন হলো, এর ফলে কি কিছু হবে? আমি ওয়াশিংটন বা তেহরানের কাছ থেকে এমন কোন সংকেত দেখিনি যা ইঙ্গিত দেয় যে, তাদের কেউই তাদের 'লাল রেখা' থেকে সরে আসতে প্রস্তুত।"
