ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের মহড়া শুরু করেছে বেলারুশ। ইউক্রেন ও উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটভুক্ত দেশগুলোর সীমান্ত ঘেঁষে পরিচালিত এই মহড়াকে ঘিরে পূর্ব ইউরোপে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে চলমান ভূরাজনৈতিক সংকটের মধ্যে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশ কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র মোতায়েন ও ব্যবহারের প্রস্তুতি যাচাই করতে বড় ধরনের যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করেছে। বেলারুশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৮ মে থেকে শুরু হওয়া এই মহড়ায় দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট, বিমান বাহিনীর বিশেষ দল এবং সহায়ক লজিস্টিক বাহিনী অংশ নিচ্ছে। রাশিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞদের সরাসরি সমন্বয়ে পরিচালিত এই প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো স্বল্প সময়ের মধ্যে পরমাণু অস্ত্র নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেওয়া, গোপনে মোতায়েন করা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তা ব্যবহারের প্রস্তুতি যাচাই করা।

বেলারুশের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবারের অনুশীলনে অপরিচিত এলাকা থেকে দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন, ছদ্মবেশে চলাচল এবং আকস্মিক নির্দেশে যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণের সক্ষমতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে অল্প সময়ে কৌশলগত অস্ত্র মোতায়েনের সামর্থ্য অর্জনই এই মহড়ার প্রধান লক্ষ্য।

বেলারুশের জেনারেল স্টাফের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মেজর জেনারেল পাভেল মুরাভেইকো বলেন, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেনাদের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো এবং পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের রণকৌশলগত প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “যেকোনো অনির্ধারিত পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা অর্জনই আমাদের লক্ষ্য।”

রাশিয়া ২০২৩ সালে বেলারুশের ভূখণ্ডে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র মোতায়েন শুরু করে। যদিও মস্কো বারবার বলেছে, এসব অস্ত্রের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার হাতেই থাকবে, তবুও বেলারুশের মাটিতে এমন অস্ত্রের উপস্থিতি এবং তা ঘিরে নিয়মিত মহড়া ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।

বেলারুশের ভৌগোলিক অবস্থান এই মহড়াকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। দেশটির সীমান্ত একদিকে ইউক্রেন, অন্যদিকে পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও লাটভিয়ার সঙ্গে যুক্ত। এই তিনটি দেশ উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটের সদস্য। ফলে বেলারুশে পরমাণু মহড়া মানেই ইউক্রেনের পাশাপাশি জোটভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়ে যাওয়া।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বেলারুশ সীমান্তে সামরিক তৎপরতা বাড়ানো হচ্ছে এবং রাশিয়া তার মিত্র দেশটিকে যুদ্ধে আরও সক্রিয়ভাবে জড়ানোর চেষ্টা করছে। ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, বেলারুশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলে অথবা সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন আক্রমণ চালানো হতে পারে।

জেলেনস্কির মতে, রাশিয়া কেবল সামরিক চাপই সৃষ্টি করছে না, একই সঙ্গে মানসিক চাপও বাড়াচ্ছে। সীমান্তে পরমাণু মহড়া এবং রিজার্ভ সেনা প্রস্তুত রাখার মতো পদক্ষেপ ইউক্রেনকে অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থানে থাকতে বাধ্য করছে।

তবে বেলারুশ সরকার এই উদ্বেগকে অমূলক বলে দাবি করেছে। মিনস্কের কর্মকর্তারা বলেছেন, মহড়াটি সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক এবং এর উদ্দেশ্য কেবল দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো। কোনো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের পরিকল্পনা এতে নেই।

বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো সম্প্রতি সেনাবাহিনীর জন্য নতুন আবর্তনমূলক প্রস্তুতি কৌশল ঘোষণা করেছেন। এর আওতায় পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ইউনিটকে নিবিড় প্রশিক্ষণে রাখা হবে, যাতে প্রয়োজনের সময় দ্রুত যুদ্ধ প্রস্তুতি নেওয়া যায়। তাঁর ভাষায়, “বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় আমাদের সবাইকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”

লুকাশেঙ্কো আরও বলেন, আধুনিক যুদ্ধে শুধু আকাশ হামলা যথেষ্ট নয়; স্থলবাহিনীর সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির বিকল্প নেই।

২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়ার বাহিনী বেলারুশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কিয়েভমুখী অগ্রযাত্রা চালায়। সেই অভিজ্ঞতার কারণে ইউক্রেন এখনো বেলারুশ সীমান্তকে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে। যদিও বর্তমানে বেলারুশ সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না, তবে দেশটির সামরিক কর্মকাণ্ড কিয়েভের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।

সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই মহড়ার কয়েকটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে। প্রথমত, রাশিয়া ও বেলারুশের পারমাণবিক সমন্বয় কতটা কার্যকর, তা পরীক্ষা করা। দ্বিতীয়ত, ইউক্রেনকে সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করতে বাধ্য করা। তৃতীয়ত, জোটভুক্ত দেশগুলোকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সতর্ক বার্তা দেওয়া।

পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও লাটভিয়া ইতোমধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করেছে। এসব দেশ দীর্ঘদিন ধরেই বেলারুশে রুশ সামরিক উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, বেলারুশে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র মোতায়েন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকি।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা এখনো দূরবর্তী হলেও এ ধরনের মহড়া ভুল বোঝাবুঝি, উত্তেজনা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে সীমান্তের কাছাকাছি সামরিক তৎপরতা বাড়লে ছোট কোনো ঘটনা থেকেও বড় সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে।

রাশিয়া বরাবরই দাবি করে আসছে, পশ্চিমা সামরিক জোটের পূর্বমুখী সম্প্রসারণ এবং ইউক্রেনে পশ্চিমা সমর্থন তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো বলছে, রাশিয়াই আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করছে।

এই বাস্তবতায় বেলারুশের মাটিতে যৌথ পরমাণু মহড়া শুধু সামরিক অনুশীলন নয়, বরং একটি শক্ত রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এতে বোঝানো হচ্ছে যে, মস্কো ও মিনস্ক তাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতিতে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রেখেছে এবং প্রয়োজনে আরও কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত।

একই সঙ্গে এই মহড়া ইউক্রেন যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাবও সামনে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধ এখন কেবল ইউক্রেনের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রতিফলন পড়ছে গোটা পূর্ব ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায়। প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপ, প্রতিটি মহড়া এবং প্রতিটি রাজনৈতিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি করছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক সংলাপের বিকল্প নেই। অন্যথায় ভুল সিদ্ধান্ত, অতিরিক্ত সামরিক প্রতিক্রিয়া বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, রাশিয়া ও বেলারুশের যৌথ পরমাণু মহড়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পূর্ব ইউরোপে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এটিকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করছে, তবুও এর কৌশলগত তাৎপর্য এবং রাজনৈতিক বার্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

news