মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেছেন, ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা অক্ষত রয়েছে—এমন দাবি সঠিক নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যদিও কিছু সীমিত সক্ষমতা এখনো রয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটিতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, উন্মুক্ত সূত্রে যে সংখ্যাগুলো প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সম্প্রতি কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়, ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, মোবাইল উৎক্ষেপণযান এবং ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোর বেশিরভাগই আবার কার্যকর করতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি হরমুজ প্রণালীর তীরে থাকা ৩৩টির মধ্যে ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে ইরান পুনরায় প্রবেশাধিকার পেয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ এবং আন্তর্জাতিক তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দেয়।
তবে অ্যাডমিরাল কুপার বলেন, শুধু অস্ত্রের সংখ্যা দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। তাঁর মতে, ইরানের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গুরুতরভাবে ভেঙে পড়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতাও ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে হাতে কিছু অস্ত্র থাকলেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা আগের মতো নেই।
তিনি বলেন, “ইরান আর আগের মতো করে যুক্তরাষ্ট্র বা আঞ্চলিক অংশীদারদের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারছে না।”
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নৌ সক্ষমতার উদাহরণ টেনে কুপার জানান, অতীতে এই এলাকায় সাধারণত ২০ থেকে ৪০টি দ্রুতগামী নৌকা দেখা যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে মাত্র দুই থেকে তিনটি। তাঁর মতে, এটি ইরানের নৌ সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অবনতির প্রমাণ।
মার্কিন বাহিনী সম্প্রতি হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টি করা ইরানের প্রায় অর্ধডজন দ্রুতগামী নৌকা ধ্বংস করেছে বলেও তিনি জানান।
অ্যাডমিরাল কুপার বলেন, ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল হলেও দেশটি এখনো আধুনিক ড্রোনের মাধ্যমে নতুন ধরনের হুমকি তৈরি করছে। তিনি উল্লেখ করেন, আগের তুলনায় এখন ইরানের ড্রোনগুলো অনেক বেশি উন্নত, জেটচালিত এবং অত্যাধুনিক সেন্সর ও বৈদ্যুতিক যুদ্ধ সক্ষমতাসম্পন্ন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা কৌশল গ্রহণ করেছে। তুলনামূলক কম খরচের একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন ব্যবহার করে তারা ইরানকে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে বাধ্য করছে। কুপারের ভাষায়, এতে যুদ্ধের ব্যয়ের ভারসাম্য এখন যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে এসেছে।
এই প্রসঙ্গে তিনি স্বল্পমূল্যের মানববিহীন যুদ্ধ ড্রোন ব্যবস্থার কার্যকারিতার কথা তুলে ধরেন। এসব ড্রোন ব্যবহার করে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
সিনেট কমিটিতে দেওয়া সাক্ষ্যে অ্যাডমিরাল কুপার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ, উৎক্ষেপণযান ও দূরপাল্লার আক্রমণকারী ড্রোনের ওপর ৪৫০টিরও বেশি হামলা চালানো হয়েছে। ড্রোন উৎক্ষেপণ ইউনিট ও সংরক্ষণাগারের ওপর চালানো হয়েছে প্রায় ৮০০ হামলা।
তিনি বলেন, ইরানের বিমান বাহিনী বর্তমানে কার্যত অকার্যকর। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ৩০ থেকে ১০০টি উড্ডয়ন পরিচালনা করা হলেও এখন সেই সংখ্যা শূন্যে নেমে এসেছে। বিমানঘাঁটি, হ্যাঙ্গার, জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং গোলাবারুদের মজুদ ধ্বংস বা অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে।
ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ৮২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট রাডার ও কমান্ড নেটওয়ার্কও ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সমুদ্রপথে ইরানের সামরিক শক্তির ওপরও বড় ধরনের আঘাত এসেছে। কুপারের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ ধরনের মোট ১৬১টি নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে। আট হাজারেরও বেশি নৌমাইনের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
ফলে ইরানের নৌবাহিনী আর কার্যকর সামুদ্রিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অবস্থায় নেই। ওমান উপসাগর কিংবা ভারত মহাসাগরে শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতাও তাদের নেই বলে মন্তব্য করেন সেন্টকম প্রধান।
তিনি আরও জানান, ইরানের কমান্ড কাঠামোর ওপর দুই হাজারেরও বেশি হামলার ফলে নেতৃত্বে শূন্যতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। সেনা সদস্যদের মধ্যে পালিয়ে যাওয়া, জনবল সংকট এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ইরান এখন লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, গাজায় হামাস এবং ইরাকভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে উন্নত অস্ত্র পাঠাতে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। তেহরান থেকে তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরান এখনো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে হস্তক্ষেপ করেছে।
অ্যাডমিরাল কুপারের সাক্ষ্যের কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ ইউনিট হন্ডুরাসের পতাকাবাহী একটি গবেষণা জাহাজ জব্দ করে। জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ উপকূলের কাছ থেকে আটক করা হয়। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানায়, জাহাজটি ইরানের জলসীমার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের মধ্যে বৈঠকেও হরমুজ প্রণালীর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। হোয়াইট হাউস জানায়, উভয় নেতা একমত হয়েছেন যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রণালীটি উন্মুক্ত রাখা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট—ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না।
ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংসের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, “ইরানের সামরিক শক্তির ধ্বংস—চলবে।”
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ আবারও ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তবে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে, মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের দাবি অনুযায়ী ইরানের সামরিক সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু দেশটির হাতে এখনো কিছু ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং নৌ সক্ষমতা রয়ে গেছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সীমিত হলেও বাস্তব হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
