কর্মজীবী নারীদের স্বস্তি দিতে কর্মস্থলে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র (ডে-কেয়ার) এবং ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত দলের নির্বাচনী ইশতেহারে এই উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন।
ইশতেহারটি পাঁচটি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন খাতের পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি তুলে ধরা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে—নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা অনেক সহজ হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নারীদের নেতৃত্ব, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার সুযোগ বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে দলটি। দেশের সুষম উন্নয়নের জন্য সব কর্মকাণ্ডে নারী সমাজকে সরাসরি যুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারে আরও জানানো হয়, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কর্মস্থলে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি গার্মেন্টস কারখানাসহ সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস এবং আদালতে কর্মরত মায়েদের জন্য আলাদা ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার চালু করা হবে। এসব কর্নারে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশে মায়েরা তাঁদের সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন।
ইশতেহার অনুযায়ী, দেশের প্রায় চার কোটি প্রান্তিক পরিবারের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়া হবে। এই কার্ড ইস্যু করা হবে পরিবারের নারীপ্রধানের নামে। এর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে প্রতি মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নগদ সহায়তা অথবা চাল, ডাল, তেল ও লবণের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এই সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। বিএনপির মতে, এই উদ্যোগ দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধামুক্তি এবং নারীর স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করবে।
নারী শিক্ষার ক্ষেত্রেও বড় ঘোষণা রয়েছে ইশতেহারে। বলা হয়েছে, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। পাশাপাশি একাডেমিক ও কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে গ্রাম ও শহর—সব জায়গায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা হবে।
নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্বাস্থ্য, গ্রামীণ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা ও মানবিক বিকাশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারীর স্বপ্ন পূরণে রাষ্ট্র যেন কোনো বাধা না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নীতিনির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নেতৃত্ব বিকাশের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। রাজনীতি ও প্রশাসনে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, নারীদের চলাফেরার নিরাপত্তা, প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে নারীর ন্যায্যতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে।
নারীর প্রতি লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, অনলাইন হয়রানি ও বুলিং প্রতিরোধে কঠোর আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে দলটি। নারী নির্যাতন, যৌতুক, এসিড নিক্ষেপ, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু পাচার রোধে কার্যকর আইন প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশেষায়িত ‘নারী সাপোর্ট সেল’ বা নারী কল্যাণকেন্দ্র গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্রে নারী চিকিৎসক, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা একসঙ্গে ভুক্তভোগী নারীদের সহায়তা দেবেন।
নারী উদ্যোক্তাদের স্বাবলম্বী করতে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পে যোগ্য নারী উদ্যোক্তাদের বিনা সুদে ঋণ, কর ছাড়, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং ডেভেলপমেন্ট ও মার্কেটিং সাপোর্ট দেওয়ার কথাও ইশতেহারে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাতে নারীর কর্মসংস্থান বাড়াতে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় সেনিটারি ন্যাপকিনের ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও বিএনপির ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
