বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত তারা ভেবেচিন্তেই নিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানানো।

বুধবার রাতে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে দেওয়া এক বিবৃতিতে শেহবাজ শরিফ বলেন,
“টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে আমরা স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছি—ভারতের বিপক্ষে কোনো ম্যাচ খেলব না। কারণ মাঠে রাজনীতির জায়গা নেই। খেলা হবে খেলাই, রাজনীতি নয়।”

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান “একটি সুচিন্তিত অবস্থান নিয়েছে” এবং এই ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো উচিত বলেই তারা মনে করে। শেহবাজ শরিফের ভাষায়, “আমি মনে করি এটি সঠিক সিদ্ধান্ত।”

এর আগে, পাকিস্তান সরকার ১ ফেব্রুয়ারি এক্স (সাবেক টুইটার)-এ জানায়, পাকিস্তান দল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেবে, তবে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলবে না।

এদিকে পাকিস্তানের এই অবস্থানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার প্রতিবাদে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তিনি পাকিস্তানকে কৃতজ্ঞতা জানান।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) জানিয়েছে, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত তাদের জানায়নি। আইসিসির বক্তব্য,
পিসিবির উচিত এই সিদ্ধান্ত দেশের ক্রিকেটের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে, তা ভালোভাবে বিবেচনা করা। কারণ এর প্রভাব বিশ্ব ক্রিকেট ব্যবস্থাপনাতেও পড়তে পারে, যার অংশ পাকিস্তান নিজেও।

পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত নিয়ে কয়েক দিন ধরেই আলোচনা চলছে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই আইসিসির সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস। তাই বিষয়টি শুধু খেলাধুলার নয়, বিশ্ব ক্রিকেটের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।

পাকিস্তান কি সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারবে?

বিবিসি উর্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিসিবির সাবেক চেয়ারম্যান নাজাম শেঠি বলেন, সময়ের প্রয়োজনেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মতে, বহু বছর ধরেই ক্রিকেটের বিশ্ব রাজনীতিতে পাকিস্তান একপ্রকার কোণঠাসা।

নাজাম শেঠির ভাষায়,
“বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বকাপে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা হয়নি। তাই পাকিস্তান কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি আইসিসির জন্য সবচেয়ে লাভজনক—এই জায়গাতেই সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ।”

বাংলাদেশ জানিয়েছিল, নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে তারা ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে স্বস্তি বোধ করছে না এবং ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরানোর আবেদন করেছিল। কিন্তু আইসিসি সেই আবেদন নাকচ করে দেয় এবং বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে টুর্নামেন্টে নেয়।

ভারত অতীতেও পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে আইসিসি ও এশিয়া কাপের মতো বহুজাতিক টুর্নামেন্টে দুই দল নিয়মিতই মুখোমুখি হয়েছে, তাও বেশিরভাগ সময় পাকিস্তানের বাইরে।

নাজাম শেঠি বলেন,
“অতীতেও সরকারি নির্দেশে দল টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। আদালতও বলেছে, সরকার যদি বোর্ডকে খেলতে না দেয়, সেটি প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না।”

তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি এখন বদলেছে।
“আগে পাকিস্তান পুরোপুরি আইসিসির রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল) আইসিসির চেয়েও বেশি আয় করছে। আমরা এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি।”

তার অভিযোগ, বর্তমান আইসিসির আর্থিক কাঠামোতে ভারত অতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছে, আর ছোট বোর্ডগুলো দিন দিন চাপে পড়ছে।
“যদি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ থেকে আয় চায়, তাহলে আইসিসিকে ন্যায়বিচার ও সমতার নীতিতে ফিরতে হবে।”

এই সিদ্ধান্তে কি বদলাবে ক্রিকেট বিশ্ব?

অনেকে মনে করছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারসাম্য ফেরাতেই পাকিস্তান এই অবস্থান নিয়েছে। তবে আইসিসি ও পিসিবির সাবেক চেয়ারম্যান এহসান মানি বলছেন ভিন্ন কথা।

তার মতে,
“এই সিদ্ধান্তে খুব বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বোর্ডগুলো মূলত নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ দেখে। তারা ভারত সফর থেকে বিপুল রাজস্ব পায়।”

এহসান মানির ভাষায়,
“সব দেশই হয় আইসিসির ওপর নির্ভরশীল, নয়তো ভারতের সফর থেকে আয় করে। তাই সহজে কেউ ত্যাগ স্বীকার করবে না।”

তিনি আরও বলেন, যদি পাকিস্তান ম্যাচ না খেলে, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে ভারতের। কারণ আইসিসির রাজস্ব বণ্টনে তারাই সবচেয়ে বেশি অংশ পায়। তবে জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার মতো ছোট বোর্ডগুলোকেও এর প্রভাব বইতে হবে।

আইসিসির সদস্য অংশগ্রহণ চুক্তি (এমপিএ) অনুযায়ী, প্রতিটি দেশকে সব ম্যাচ খেলতে হয়। তবে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সরকারি নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে ছাড় দেওয়া হয়। সরকার যদি দল পাঠাতে বাধা দেয়, আইসিসি সাধারণত সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করে।

আগেও এমন নজির রয়েছে—
২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারত পাকিস্তানে কোনো ম্যাচ খেলেনি, সব ম্যাচ হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। একইভাবে ২০২৩ এশিয়া কাপেও ভারত পাকিস্তানে না গিয়ে কলম্বোতে ম্যাচ খেলেছিল।

ক্ষতি কার—পাকিস্তান, ভারত না আইসিসি?

আইসিসি জানিয়েছে, তারা সমাধানের পথ খুঁজতে প্রস্তুত। তবে পিসিবিকে সতর্কও করেছে—এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকতে পারে।

নাজাম শেঠির মতে, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ না হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলো।
“ম্যাচ না হলে তারা চুক্তিকে অলাভজনক বলে বাতিল করতে পারে, তখন আইসিসিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

তিনি মনে করেন, আইসিসি বাংলাদেশের সঙ্গে অবিচার করেছে।
“পাকিস্তান যদি চুপ থেকে ম্যাচের দিন মাঠে না নামত, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতো। আশা করি আইসিসি এবার বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেবে।”

 

news