ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চ তৈরি করতে গিয়ে যেন পশুহত্যার মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে মরক্কোয়। ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পেয়েছে দেশটি। আর সেই মেগা ইভেন্টকে ঘিরে দেশকে 'পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন' দেখানোর নামে শুরু হয়েছে নির্বিচারে পথকুকুর নিধন। পশুপ্রেমী সংগঠনগুলোর দাবি, বিশ্বকাপের আগে ৩০ লাখ পথকুকুর মেরে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছে মরক্কো সরকার ।

২০২৩ সালের অক্টোবরে স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে ২০৩০ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে মরক্কোর নাম ঘোষণা করে ফিফা । তারপর থেকেই কুকুর নিধনের পরিমাণ বেড়েছে বলে অভিযোগ আন্তর্জাতিক পশু কল্যাণ জোটের (আইডব্লিউপিসি)। তাদের দাবি, বিশ্বকাপ উপলক্ষে পর্যটক ও বিদেশি অতিথিদের কাছে দেশকে আকর্ষণীয় করে তুলতে রাস্তাঘাট 'পরিষ্কার' করার নামে এই নিধনযজ্ঞ চালানো হচ্ছে ।

কীভাবে নিধন করা হচ্ছে এই অসহায় প্রাণীদের? সংগঠনটির দেওয়া তথ্য ও ছবি বলছে, অত্যন্ত নৃশংস পদ্ধতিতে কুকুরগুলিকে মারা হচ্ছে। গলায় ক্ল্যাম্প পরিয়ে জোরপূর্বক ট্রাকে তোলা হচ্ছে। তারপর বিষ খাইয়ে, গুলি করে বা পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে ।

কোথাও কোথাও কুকুরগুলিকে কয়েকদিন না খাইয়ে রেখে তারপর জীবন্ত পুড়িয়ে মারার অভিযোগও এসেছে । আইডব্লিউপিসির দাবি, মারাকেশের উপকণ্ঠে আলাদা 'কিল সেন্টার' তৈরি করা হয়েছে, যেখানে মাংসের হুক ও ধোয়ামোছার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে নিয়ে গিয়ে কুকুরগুলিকে 'প্রসেস' করে ফেলা হচ্ছে । আহত কুকুরগুলো রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করতে করতে মারা যাচ্ছে, তাদের লাশ পড়ে থাকছে পচে যাওয়া পর্যন্ত ।

এমন নৃশংসতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বজুড়ে সরব হয়েছেন পশুপ্রেমী ও তারকারা। অস্কার জয়ী অভিনেতা মার্ক রাফালো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিয়ে লেখেন, 'বিশ্বের বড় ক্রীড়া ইভেন্টের জন্য লাখ লাখ কুকুর হত্যা করা অগ্রগতি নয়, এটা নৈতিক ব্যর্থতা। বিশ্বকাপের উচিত বিশ্বকে এক করা, বন্ধ দরজার আড়ালে চলা নৃশংসতার ওপর নয়। মানবিক সমাধান আছে, দয়া বেছে নেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব' ।

এদিকে পুরো ঘটনা অস্বীকার করেছে মরক্কো সরকার। লন্ডনে অবস্থিত মরক্কোর দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পথকুকুর নিধনের কোনো পরিকল্পনা নেই বলেই তাদের। তারা মানবিক ও টেকসই প্রাণী ব্যবস্থাপনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ।

মরক্কোর দাবি, ২০১৯ সালেই তারা ট্র্যাপ-নিউটার-ভ্যাকসিনেট-রিটার্ন (টিএনভিআর) কর্মসূচি চালু করেছে এবং প্রাণীদের জন্য ক্লিনিক ও সাপোর্ট প্রোগ্রামে বিনিয়োগ করছে । তবে আইডব্লিউপিসি একে 'আইওয়াশ' বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, মরক্কো সরকারের মদতেই প্রতিদিন এই নৃশংসতা চালানো হচ্ছে ।

এ বিষয়ে ফিফা কী বলছে? ফিফার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ২০৩০ বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার সময় মরক্কো প্রাণী অধিকার রক্ষায় অঙ্গীকার করেছিল এবং আগস্ট ২০২৪ থেকে দেশটিতে প্রাণী নিধন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফিফা আইডব্লিউপিসির সাথে কাজ করছে এবং মরক্কোর কর্তৃপক্ষের কাছে খসড়া আইন নিয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে ।

তবে পশুপ্রেমী সংগঠনগুলোর দাবি, ফিফা শুধু মুখে বড় বড় কথা বললেও বাস্তবে কিছু করছে না। তারা বলছেন, ফিফা যদি ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে এই নৃশংসতার অংশীদার হবে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থাটি ।

খসড়া আইন প্রস্তাব করা হলেও সেটিও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই আইনে পথপ্রাণী ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা বা নির্যাতন করলে ২ থেকে ৬ মাসের জেলের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে পশুদের আশ্রয় দেওয়া বা খাওয়ানোর ক্ষেত্রেও জরিমানা বা জেলের বিধান রাখা হয়েছে! সমালোচকরা বলছেন, এই আইন আসলে পশু রক্ষা নয়, বরং পথপ্রাণী নির্মূলের পথ আরও সুগম করবে ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ফিফা কি সত্যিই ব্যবস্থা নেবে? নাকি মরক্কোর হাত ধরে আরও লাখ লাখ নিরীহ প্রাণীকে প্রাণ দিতে হবে বিশ্বকাপের বেদিতে?

 

Walton Ads