চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে, কিন্তু পাপ কখনো বাপকে ছাড়ে না! ৫৩ বছর পর একাত্তরের সেই জঘন্য ঘাতকদের কপালে শনির দশা নেমে এসেছে। যখন মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের রাজপথে আবারো বুক ফুলিয়ে হাঁটবে একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধীরা, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন থেকে এলো এক বজ্রপাত। মার্কিন কংগ্রেসে একাত্তরের সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে 'গণহত্যা' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি উঠেছে। আর লক্ষ্যবস্তু কে জানেন? সেই জামায়াতে ইসলামী! কীভাবে মার্কিন পার্লামেন্টে কোণঠাসা হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের এই মৌলবাদী শক্তি।
কথায় আছে, 'পাপের ঘড়া পূর্ণ হলে বিনাশ অনিবার্য।' একাত্তরের মাটিতে যে রক্তপাত জামায়াতে ইসলামী ঘটিয়েছিল, তার অভিশাপ যেন আজও তাদের পিছু ছাড়ছে না। দীর্ঘ ৫৩ বছর পর মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আইনপ্রণেতা গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান যে প্রস্তাব এনেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, একাত্তরের অপারেশন সার্চলাইট কোনো সাধারণ সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি ছিল একটি পরিকল্পিত গণহত্যা।
ওহাইয়ো থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ অর্থাৎ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবটি তুলে ধরেছেন। তার মতে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসররা যা করেছে, তা জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী পরিষ্কার একটি গণহত্যা। ল্যান্ডসম্যান দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল অনেক আগেই এই জঘন্য অপরাধকে গণহত্যার তকমা দেওয়া এবং অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
এই প্রস্তাবের সবচেয়ে বিধ্বংসী অংশটি হলো জামায়াতে ইসলামীর বিচারের দাবি। প্রস্তাবে সরাসরি বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করার জন্য এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। যারা একাত্তরে মা-বোনের ইজ্জত লুট করেছে এবং মুক্তিকামী মানুষকে জবাই করেছে, তারা আজ বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসার যে চেষ্টা করছে, তাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছে আমেরিকা।
মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত এই প্রস্তাবে বাংলাদেশে বসবাসরত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও কড়া আহ্বান জানানো হয়েছে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি ক্যাপিটল হিলে অনুষ্ঠিত এক শুনানিতে উঠে আসে যে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চলা অত্যাচার এবং দেশজুড়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকদের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।
প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শুরু হওয়া 'অপারেশন সার্চলাইট' ছিল এক অমানবিক বর্বরতা। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের ইসলামপন্থি সহযোগী জামায়াতে ইসলামী মিলে নির্বিচারে বাঙালিদের ওপর হামলা চালায়। সে সময় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালিকে লক্ষ্যবস্তু করা হলেও হিন্দুদের বিশেষভাবে নির্মূল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। জামায়াতের দোসররা পাকিস্তানি সেনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেত গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করার জন্য।
নিউ ইয়র্কে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার দীলিপ নাথ এই প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটে ভয়াবহ কিছু তথ্য দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর জঘন্য উত্থান ঘটেছে। এমনকি শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ডক্টর ইউনূসের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে জামায়াত আবারো মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তার মতে, এই উগ্রবাদী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ না করলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব আবারো সংকটে পড়বে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে একাত্তরের দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের 'ভালো মানুষ' সাজানোর যে চেষ্টা চালানো হয়েছে, তাকে 'তামাশা' বলে অভিহিত করেছেন দীলিপ নাথ। একাত্তরের ঘাতকদের জন্য শোক প্রস্তাব গ্রহণ করার মতো নজিরবিহীন ঘটনা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। দেশের মাটিতে যখন খুনিরা পুনর্বাসিত হচ্ছে, তখন মার্কিন কংগ্রেসে এই প্রস্তাব পাস হওয়া মানে জামায়াতের জন্য চূড়ান্ত পতনের ঘণ্টা বেজে ওঠা।
যদি মার্কিন কংগ্রেসে এই প্রস্তাবটি পাস হয়, তবে জামায়াতে ইসলামীর ওপর নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার খড়গ নেমে আসতে পারে। একাত্তরের ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই দলটির কোনো বৈধতা থাকবে না। এর ফলে শুধু জামায়াত নয়, তাদের আশ্রয় প্রদানকারী রাজনৈতিক শক্তিগুলোও চরম বিপাকে পড়বে। বিশ্ববাসীর কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, উগ্রবাদ আর গণহত্যার দোসরদের জন্য আধুনিক বিশ্বে কোনো জায়গা নেই।
ইতিহাসের চাকাকে উল্টো দিকে ঘোরানোর ক্ষমতা কারো নেই। একাত্তরের শহীদের রক্ত আজ মার্কিন কংগ্রেসের অলিন্দে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী যে অন্ধকার অধ্যায় বাংলাদেশে শুরু করতে চাইছে, আন্তর্জাতিক মহল তা কঠোরভাবে নজরদারি করছে। ধর্মকে পুঁজি করে যারা রাজনীতি করে এবং সহিংসতায় মেতে ওঠে, তাদের শেষ রক্ষা কখনোই হয় না। এই প্রস্তাব কেবল একটি স্বীকৃতি নয়, বরং এটি জামায়াতের ধ্বংসের সূচনা মাত্র।
আপনি কি মনে করেন মার্কিন কংগ্রেসের এই প্রস্তাবে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি চিরতরে নিষিদ্ধ হবে? আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টে অবশ্যই লিখুন।
