যুদ্ধ একটি প্রতারণা, যুদ্ধ সর্বদাই পরাজয়: পোপ ফ্রান্সিস

১০-১১ মে ভ্যাটিকান সিটিতে মানব ভ্রাতৃত্বের জন্য দ্বিতীয় বিশ্ব সভার আয়োজন করা হয়। এতে বিশ্বের ত্রিশজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, মেয়র, ডাক্তার, ব্যবস্থাপক কর্মী, ক্রীড়া চ্যাম্পিয়ন এবং সাধারণ নাগরিক যোগদান করেন। এই সভায় পোপ ফ্রান্সিস এ কথা বলেন।

সম্মেলনে উক্ত বিশ্ব সভায় দু'টি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে বাংলাদেশের শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং শান্তিতে নোবেল বিজয়ী গুয়াতেমালার ড. রিগোবার্তা মেনচু তুম সভাপতিত্ব করেন। সভায় পরিবেশ, শিক্ষা, ব্যবসা, কৃষি, মিডিয়া এবং স্বাস্থ্যে মানব ভ্রাতৃত্বের প্রচারের উপায় নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মঙ্গলবার ইউনূস সেন্টার থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানানো হয়। 

গোলটেবিল আলোচনার সূচনা করে ভ্যাটিকানের সেক্রেটারি অফ স্টেট কার্ডিনাল পিয়েত্রো প্যারোলিন বলেন, মানুষ যখন শান্তিকে অসম্মান করে এবং যুদ্ধ চালায়, "তারা নিজেদের জন্য এমন একটি দিক নির্ধারণ করে যা সৃষ্টির বিরোধিতা করে । 

তিনি আরও বলেন, যারা মানুষকে হত্যা করে, তারা কেবল অন্যদের মর্যাদাকে আঘাত করে না বরং নিজেদেরও সম্মানহানী করে। 
 
অনুষ্ঠানের শান্তি গোলটেবিল বৈঠক থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, হত্যা বন্ধ করতে এবং মানবিক সহায়তার নিরাপদ ও অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য আহ্বান জানানো হয়। 

তারা বলেন, গাজায় প্রায় ১৪০০০ শিশু নিহত হয়েছে কিংবা  যেসব শিশু ক্ষুধা ও অসুখে মারা যাচ্ছে, বোমা হামলায় আক্রান্ত হাসপাতালগুলোতে তারা আশ্রয় নিতে পারে না। সেখানে  তারা আর অপেক্ষা করতে পারে না। গাজায় মানবিক সাহায্যের অনুমতি দিতে হবে এবং জিম্মি ও রাজনৈতিক বন্দিদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
 
এছাড়া ঘোষণায় আরো বলা হয়, "আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি ইসরায়েল এবং একটি ফিলিস্তিনের দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পাশাপাশি জেরুজালেম শহরের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে নিশ্চিত বিশেষ মর্যাদাকে দৃঢতার সাথে অনুসরণ করতে হবে। যাতে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিরা শান্তি এবং নিরাপত্তার সাথে বসবাস করতে পারে।
 
সভায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমাদের ভাগ করে নেওয়া এবং যত্ন নেওয়ার মানবিক মূল্যবোধের সাথে মানুষ হিসাবে নিজেদেরকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে। কারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো তৈরির সময় মানুষ নিজেদের সম্পর্কে যেভাবে চিন্তা করে, তা মানবতার জন্য অস্ত্রের চেয়েও বেশি বড় হুমকি। 
 
তিনি আরো বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করতে হবে। আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোতে সামাজিক ব্যবসার ধারণা এবং অনুশীলনকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে আমাদের তিনটি শূন্যের একটি নতুন সভ্যতা তৈরি করতে হবে। শুন্য বিশ্ব উষ্ণায়ন, শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীকরণ এবং শূন্য বেকারত্ব, তৈরি করতে নিজেদেরকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে তুলতে হবে। 
 ইউনূস আরো বলেন, বর্তমান সভ্যতার "মুনাফা সর্বোচ্চকরণ" নীতির ক্রমাগত প্রক্রিয়া হিসাবে মানুষকে "চাকরি সন্ধানকারী" হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে । তার কারণে মুষ্টিমেয় মুনাফা অর্জনকারী তাদের সম্পদ ক্রমাগতভাবে আকাশচুম্বি করে যাচ্ছে।
 
অনুষ্ঠানে নাসার প্রশাসক এবং ফ্লোরিডার প্রাক্তন ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর বিল নেলসন বলেন, “আমি  মহাশূন্য থেকে  জাতিগত বিভাজন দেখিনি, আমি ধর্মীয় বিভাজন দেখিনি এবং আমি রাজনৈতিক বিভাজন দেখিনি। আমি যা দেখেছি তা হল পৃথিবীর নাগরিক হিসাবে আমরা সবাই একসাথে আছি।

গুয়াতেমালান আদিবাসী মানবাধিকার কর্মী এবং ১৯৯২ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী রিগোবার্তা মেঞ্চু তুম বর্তমান সমাজের বস্তুগত, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক অবক্ষয়ের সমালোচনা করে বলেন, "সম্পূর্ণ মানুষ হওয়ার জন্য আমাদের আত্মাকে লালন করার মত মানুষের প্রয়োজন। 

দক্ষিণ আফ্রিকা এবং মোজাম্বিক উভয়েরই প্রাক্তন ফার্স্ট লেডি গ্রাসা মাচেল ম্যান্ডেলা, নেলসন ম্যান্ডেলার স্ত্রী, দা এল্ডার্স-এর ভাইস চেয়ারপার্সন, সমাজের দ্বারা সৃষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন ‘যেসব প্রতিষ্ঠান কিছু মানুষকে মনে অধিকার দেয় যে তারা অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, এমনকি তারা বিশ্বাস করে যে তারা অন্যদের হত্যা করতে পারে।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা ১১ মে একটি  একান্ত সভায় পোপ ফ্রান্সিসের সাথে দেখা করেন। মানব ভ্রাতৃত্বের দ্বিতীয় বিশ্ব সভায় প্রায় ৩৫০ জন অংশগ্রহণকারীকে সম্বোধন করে  পোপ ফ্রান্সিস তাদের একটি বিচ্ছিন্ন বিশ্বে মানব ভ্রাতৃত্বকে উন্নীত করার জন্য তাদের প্রচেষ্টা এবং অধ্যবসায়ের জন্য উৎসাহিত করেন।

পোপ বলেন, "যুদ্ধ একটি প্রতারণা, যুদ্ধ সর্বদাই পরাজয় । ঠিক যেমন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ধারণা ভয়ের প্রতিবন্ধকতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটাও একটা প্রতারণা। দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে আমাদের অবশ্যই সাধারণ মানবতার স্বীকৃতিতে ফিরে যেতে হবে এবং জনগণের জীবনের কেন্দ্রে ভ্রাতৃত্বকে স্থান দিতে হবে। 

তিনি অরো বলেন, রাজনৈতিক শান্তির জন্য প্রয়োজন হৃদয়ের শান্তি, যাতে মানুষ এই আত্মবিশ্বাসে একত্রিত হতে পারে যে জীবন সর্বদা সব ধরনের মৃত্যুকে জয় করে। "আমাদের মেনে নিতে হবে যে যুদ্ধ সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট, এটি ঈশ্বর প্রদত্ত নয়। এর মানে আমাদের পূর্বাবস্থায় ফেরানোর ক্ষমতা আছে, আমাদের যুক্তি পরিবর্তন করার ক্ষমতা আছে। সূত্র: ওয়ান ইন্ডিয়া বাংলা

এনবিএস/ওডে/সি

Walton Ads