ভারতের তথাকথিত ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর নামে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি উঠলেও, ইসলামাবাদ দৃঢ়ভাবে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক শক্তি এই হামলার মুখে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে বলে দাবি করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ভারতের প্রচারণাকে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে পাকিস্তান এখন কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ভারত দাবি করেছে, তাদের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে পাকিস্তান ও আজাদ জম্মু-কাশ্মীরে -পিওজেকে সন্ত্রাসবাদীদের ৯টি ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে। তারা বলছে, স্ক্যাল্প ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং হ্যামার ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছে, যা পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চিহ্নিত বা আটকাতে পারেনি। তবে পাকিস্তান এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ -আইএসপিআর জানিয়েছে, ভারতের কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করেনি। বরং পাকিস্তানের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম।
পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল শক্তি হলো চীনের তৈরি এইচকিউ-৯পি/এইচকিউ-৯বিই, যা ১০০ থেকে ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে সক্ষম। এই ব্যবস্থায় রয়েছে উন্নত এইএসএ রাডার এবং ১৪ ম্যাক গতির ক্ষেপণাস্ত্র। এছাড়া, এলওয়াই-৮০/এলওয়াই-৮০ই এবং এফএম-৯০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা যথাক্রমে ৪০-৭০ কিলোমিটার এবং ১৫ কিলোমিটার এলাকায় সুরক্ষা প্রদান করে। পাকিস্তানের সামরিক বিশ্লেষকরা জানান, এই ব্যবস্থাগুলো ভারতের স্ক্যাল্প বা ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের মতো হুমকি মোকাবিলায় পুরোপুরি সক্ষম। ভারতের দাবি যে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে, তা কেবল প্রোপাগান্ডা বলে মনে করেন তারা।
পাকিস্তান স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ২০১৯ সালের বালাকোট ঘটনা, যখন ভারত দাবি করেছিল তাদের মিরাজ-২০০০ জেট দিয়ে জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে। পাকিস্তান তখন প্রমাণ করেছিল যে কোনো উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়নি এবং ভারতের একটি মিগ-২১ বিমান গুলি করে ফেলেছিল। এবারও পাকিস্তান দাবি করছে, ভারতের তথাকথিত ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ দুটি রাফাল-সহ পাঁচটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান গুলি করে ফেলা হয়েছে। যদিও ভারত এই দাবি অস্বীকার করেছে, তবে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই খবর ভারতের প্রচারণার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের শক্ত অবস্থান তুলে ধরেছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই হামলার দাবিকে ভারতের আগ্রাসী নীতির অংশ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জাতিসংঘে এই ঘটনা উত্থাপনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ভারতের ‘অপপ্রচার’ তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের জেএফ-১৭ লড়াকু জেট এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেকোনো ভারতীয় হামলার জবাব দিতে প্রস্তুত। তারা আরও বলেন, পাকিস্তান শান্তি চায়, কিন্তু তাদের সার্বভৌমত্বের উপর হামলা হলে কঠোর প্রতিশোধ নেবে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শক্তি তুলে ধরতে আইএসপিআর জানিয়েছে, তাদের এইচকিউ-৯পি এবং এলওয়াই-৮০ ব্যবস্থা লাহোর, ইসলামাবাদ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরে সুরক্ষা নিশ্চিত করছে। ২০২২ সালে ভারতের ভুলবশত ছোঁড়া ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের ঘটনায় পাকিস্তান তাৎক্ষণিকভাবে সতর্কতা জারি করেছিল এবং কূটনৈতিকভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। এবারও তারা একইভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। পাকিস্তানের জনগণও তাদের সামরিক বাহিনীর পাশে দাঁড়িয়েছে, এবং দেশজুড়ে ভারতের এই ‘মিথ্যা প্রচারণার’ বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে।
ভারত তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে রাশিয়ার এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ, ইজরায়েলের সঙ্গে যৌথ উৎপাদিত বারাক-৮ এবং ডিআরডিওর আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে। এই ব্যবস্থাগুলো ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়। তবে পাকিস্তানের বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা এখনো বাস্তব যুদ্ধে পরীক্ষিত হয়নি। বিপরীতে, পাকিস্তানের জেএফ-১৭ জেট এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ২০১৯ সালে ভারতের বিমান গুলি করে প্রমাণ করেছে তাদের কার্যক্ষমতা।
পাকিস্তান উল্লেখ করেছে ২০১১ সালের ওসামা বিন লাদেন অভিযান, যেখানে মার্কিন কপ্টার তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করলেও পাকিস্তান পরে এর কূটনৈতিক জবাব দিয়েছিল। এই ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে পাকিস্তান তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে। বর্তমানে তাদের সামরিক বাহিনী উন্নত রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র এবং লড়াকু জেট দিয়ে যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় প্রস্তুত।
ভারতের তথাকথিত ‘অপারেশন সিঁদুর’ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণার একটি প্রচেষ্টা বলে দাবি করেছে ইসলামাবাদ। তাদের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক অবস্থান এই অভিযোগকে নস্যাৎ করেছে। পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাদের সামরিক ও জনগণের ঐক্য কীভাবে ভারতের আগ্রাসনকে মোকাবিলা করবে, তা নিয়ে বিশ্ব এখন অপেক্ষায়।