পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে ফের রক্ত ঝরল। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতে দুই দেশের সেনারা একে অপরের চৌকি দখল ও ধ্বংসের দাবি করেছে। এমনকি সেনা হত্যার অভিযোগও উঠেছে দুই পক্ষের মধ্যেই।
আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের মুখপাত্র জবিহুল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, শনিবার (১১ অক্টোবর) রাতে তাদের বাহিনীর প্রতিশোধমূলক হামলায় অন্তত ৫৮ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে। এই হামলার পেছনে কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছে, কাবুল ও পাকতিয়া প্রদেশে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ।
গত বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) রাতে আফগান রাজধানী কাবুল ও সীমান্তবর্তী পাকতিয়া প্রদেশে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে। আফগান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনায় পাকিস্তানকে দায়ী করে বিবৃতি দেয়। তবে ইসলামাবাদ না অস্বীকার করেছে, না নিশ্চিত করেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের ২৩ জন সেনা নিহত হয়েছে, তবে পাল্টা অভিযানে তারা ২০০ জন তালেবান যোদ্ধা ও সহযোগীকে হত্যা করেছে বলে দাবি করেছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে ‘বিনা উসকানিতে গুলি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
১৯৯৬ সালে তালেবান প্রথম ক্ষমতায় এলে পাকিস্তান ছিল তাদের অন্যতম সমর্থক দেশ। কিন্তু ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগানিস্তান পাকিস্তানের নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’ (টিটিপি)-এর আশ্রয়দাতা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিটিপি-র হামলায় পাকিস্তানে বহু প্রাণহানি ঘটেছে। ইসলামাবাদভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক সিআরএএস-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে টিটিপির হামলায় অন্তত ২,৪১৪ জন নিহত হয়েছেন। এই ধারা চলতে থাকলে এ বছর পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী হতে পারে।
সংঘাতের সূত্রপাত মূলত ২০২২ সালে ইমরান খানের ক্ষমতাচ্যুতির পর। তখন তিনি তালেবানের মধ্যস্থতায় টিটিপির সঙ্গে যুদ্ধবিরতি করেছিলেন। কিন্তু সেই চুক্তি ভেঙে গেলে সংঘাত ফের বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামাবাদ আফগান সীমান্তে বিমান হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে, যার লক্ষ্যবস্তু ছিল টিটিপির ঘাঁটি।
উভয় পক্ষের অবস্থান
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ আফগান হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির ভাষায়, “তালেবান বেসামরিক নাগরিকদের টার্গেট করছে, যা অগ্রহণযোগ্য।”
অন্যদিকে আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইনায়াতুল্লাহ খাওয়ারিজমি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের হামলার পাল্টা জবাব দেয়া হয়েছে। সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করলে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইরান, কাতার ও সৌদি আরব। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দুই দেশকে সংযমের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “সংলাপই একমাত্র পথ।”
এদিকে তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি বর্তমানে ভারতের সফরে রয়েছেন। তবে নয়াদিল্লি এখনও সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ইসলামাবাদ বরাবরের মতোই আফগান-ভারত সম্পর্ককে সন্দেহের চোখে দেখছে।
পরিস্থিতি কি আরও খারাপ হবে?
পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি মনে করেন, সংঘাত আরও বড় আকারে গড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। তিনি বলেন, “দুই দেশের মধ্যে মূল সমস্যা টিটিপি। আফগানিস্তান যতদিন নিজেদের ভূখণ্ডে তাদের উপস্থিতি স্বীকার না করবে, ততদিন উত্তেজনা থেকেই যাবে।”