পাকিস্তানের বিশেষ আদালত তোশাখানা–২ দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিকে ১৭ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন। শনিবার রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে স্থাপিত বিশেষ আদালত এই রায় ঘোষণা করেন। খবর এনডিটিভির।
৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে রয়েছেন। ২০২২ সালের এপ্রিলে ক্ষমতা হারানোর পর তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়। তোশাখানা–২ মামলাটি ২০২১ সালে সৌদি সরকারের কাছ থেকে পাওয়া রাষ্ট্রীয় উপহার নিয়ে কথিত জালিয়াতির অভিযোগ ঘিরেই।
এই রায় ঘোষণা করেন বিশেষ আদালতের বিচারক শাহরুখ আরজুমান্দ। পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান বর্তমানে আদিয়ালা কারাগারেই বন্দী।
আদালত পাকিস্তান দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা অনুযায়ী বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে ইমরান খান ও বুশরা বিবিকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং দুর্নীতি দমন আইনের বিভিন্ন ধারায় আরও ৭ বছরের কারাদণ্ড দেন। পাশাপাশি তাঁদের প্রত্যেককে ১৬.৪ মিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি জরিমানাও করা হয়েছে।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেছে, সাজা নির্ধারণের সময় ইমরান খানের বয়স এবং বুশরা বিবি নারী—এই দুটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সে কারণেই তুলনামূলক নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কম সাজা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮২-বি ধারার সুবিধা অনুযায়ী, হাজতে কাটানো সময় সাজা হিসেবে গণ্য হবে।
মামলার শুনানিতে মোট ২১ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন। রায় ঘোষণার সময় ইমরান খান ও বুশরা বিবি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে ইমরান খান সব অভিযোগ অস্বীকার করে মামলাটিকে ‘বিদ্বেষপূর্ণ, বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দায়ের হওয়া এই মামলায় অভিযোগ করা হয়, দামি ঘড়ি, হীরা ও সোনার অলঙ্কারসহ মূল্যবান উপহার তোশাখানায় জমা না দিয়ে দম্পতি সেগুলো বিক্রি করে দেন। অর্থ প্রতিমন্ত্রী বিলাল আজহার কায়ানি জিও নিউজকে বলেন, উপহারগুলো তোশাখানায় জমা দেওয়া তাঁদের আইনি দায়িত্ব ছিল। তাঁর দাবি, অলঙ্কার সেটের প্রকৃত মূল্য ছিল প্রায় ৭০ মিলিয়ন রুপি, কিন্তু মূল্যায়ন করা হয়েছিল মাত্র ৫.৮–৫.৯ মিলিয়ন রুপি। তিনি আরও বলেন, ইমরান খান ও বুশরা বিবি ‘পানির দরে’ সেই সেট কেনার চেষ্টা করেছিলেন।
তোশাখানা ক্যাবিনেট ডিভিশনের অধীন একটি বিভাগ, যেখানে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দেওয়া উপহার সংরক্ষণ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, জমা দেওয়ার পর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সেই উপহার পুনরায় কেনা যায়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট বুশরা বিবিকে এই মামলায় জামিন দেন এবং এক মাস পর ইমরান খানও জামিন পান। গত বছরের ডিসেম্বরে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। আদিয়ালা কারাগারেই বিচার চলতে থাকে, যেখানে আল-কাদির ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর থেকে দুজনই বন্দী ছিলেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে তাঁরা হাইকোর্টে আপিল করতে পারবেন।
২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে থাকা ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতে এক মাসের বেশি সময় ধরে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল ২ ডিসেম্বর, যখন বোন উজমা খানকে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে জেল কর্তৃপক্ষের দাবি, ইমরান খান সুস্থ আছেন।
এরই মধ্যে জাতিসংঘের বিশেষ দূত অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস ইমরান খানের ‘অমানবিক ও মর্যাদাহানীকর’ আটক অবস্থার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পাকিস্তান সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের নির্জন কারাবাস ইমরান খানের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইমরান খানকে বাইরের কোনো কার্যক্রম, অন্য বন্দীদের সঙ্গে মেলামেশা কিংবা জামাতে নামাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। আইনজীবী ও পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতেও নানা বাধা রয়েছে।
ইমরান খান ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাকিস্তানের ১৯তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।