হাইপারসনিক 'ফাত্তাহ' থেকে ভূগর্ভস্থ মিসাইল সিটি, ড্রোন-মিসাইলের ভয়ঙ্কর জোট—মধ্যপ্রাচ্যে ইরান কীভাবে বদলে দিচ্ছে শক্তির ভারসাম্য? পড়ুন সেই ৫ কারণ
ঢাকা সংবাদদাতা: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রে ইরানের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আর অর্থনৈতিক চাপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তেহরান আজ এমন এক সামরিক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা ওয়াশিংটন থেকে তেল আবিব পর্যন্ত শত্রুদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই 'মিসাইল আর্সেনাল' শুধুই আত্মরক্ষার ঢাল নয়, বরং প্রতিপক্ষের জন্য এক ভয়ঙ্কর ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সেই ৫টি কারণ, যা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের অবিসংবাদিত মিসাইল শক্তিতে পরিণত করেছে:
১. নিখুঁত নিশানা ক্ষমতা: 'খায়বার শেকান' থেকে 'রেজওয়ান'
এক সময় ইরানের মিসাইল নিয়ে উপহাস করা হলেও এখন আর সেই দিন নেই। 'খায়বার শেকান' বা 'রেজওয়ান' মিসাইল শত শত কিলোমিটার দূর থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম। এই মিসাইলগুলোর নির্ভুলতা এতটাই বেড়েছে যে, শত্রুপক্ষের সামরিক ঘাঁটিকে মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে দিতে পারে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, এসব মিসাইলের সারকেস ত্রুটি ১০ মিটারেরও কম।
২. হাইপারসনিক যুগের সূচনা: 'ফাত্তাহ' আতঙ্ক
ইরানের 'ফাত্তাহ' হাইপারসনিক মিসাইল শব্দের চেয়ে ১৫ গুণ দ্রুত। এটি রাডার বা আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শনাক্ত করতে পারবে না। গত বছর আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত এই মিসাইল আকাশের যেকোনো ডিফেন্স শিল্ডকে ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফাত্তাহ-২ মডেলে আরও উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে, যা ইসরায়েলের 'আয়রন ডোম' বা আমেরিকার 'প্যাট্রিয়াট' সিস্টেমকে প্রায় অকেজো করে দেবে।
৩. মাটির নিচে 'মিসাইল সিটি': গুহায় লুকানো শক্তি
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশ পাহাড়ের গুহা ও ভূগর্ভস্থ টানেলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনী সম্প্রতি উপসাগরীয় অঞ্চলের তীরে নতুন কয়েকটি 'মিসাইল সিটি' উদ্বোধন করেছে। একবার আক্রমণ করলে সব মিসাইল ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এই ভূগর্ভস্থ শহরগুলোতে উন্নত কমান্ড সেন্টার, মিসাইল লঞ্চার এমনকি ড্রোন ঘাঁটিও রয়েছে।
৪. ড্রোন-মিসাইল সমন্বয়: শাহেদ-এর ভয়ঙ্কর জাল
ইরান ড্রোন ও মিসাইলের ভয়ঙ্কর সমন্বয় করেছে। প্রথমে শত শত সস্তা ড্রোন পাঠিয়ে শত্রুর এয়ার ডিফেন্স ব্যস্ত রাখা হয়, তারপর মূল ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের উদাহরণ দেখিয়েছে শাহেদ ড্রোনের কার্যকারিতা। এই কৌশলে শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পুরো হিসেব পাল্টে গেছে।
৫. প্রক্সি নেটওয়ার্কে প্রযুক্তি বিস্তার: হুথি-হিজবুল্লাহ জোড়
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি হিজবুল্লাহ ও হুথি আন্দোলনের হাতে পৌঁছেছে। ফলে ইরানকে আক্রমণ করলে পাল্টা জবাব তেহরান থেকে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো প্রান্ত থেকে আসতে পারে। ইয়েমেনের হুথিরা ইরানের মিসাইল দিয়ে সৌদি আরব ও ইসরায়েলে হামলা চালাচ্ছে। লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছে এখন নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে।
ভারসাম্য বদলে দিয়েছে ইরান
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের এই সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের 'আয়রন ডোম' বা আমেরিকার 'প্যাট্রিয়াট' সিস্টেম সব মিসাইল ঠেকাতে পারবে না— গত কয়েক মাসের উত্তপ্ত পরিস্থিতি তার প্রমাণ। ইরানের এই 'ডিটারেন্স' ক্ষমতা শুধু দেশকে নিরাপদ রাখে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে শত্রুদের জন্য এক নতুন বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করছে।
