হামলা, গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ আর অবরোধে বিপর্যস্ত ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। নামমাত্র যুদ্ধবিরতি হলেও থামেনি ইসরায়েলের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র আর ট্যাঙ্কের তাণ্ডব। পাঁচ মাসেও ধ্বংসস্তূপে পরিণত এই নগরীতে পৌঁছায়নি পর্যাপ্ত ত্রাণ
। খাবার-ওষুধের তীব্র সংকট, নিরাপদ পানির অভাব—সবকিছু মিলিয়ে গাজাবাসী যেন আজন্ম রোজাদার। তবুও রমজানের আগমনকে তারা স্বাগত জানিয়েছে। ইফতার-সেহরির নিশ্চয়তা নেই অনেক পরিবারের, কিন্তু ধ্বংসাবশেষ আর আশ্রয়কেন্দ্রে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর সামান্য জোগাড়যন্ত্র। ভয় আর অনিশ্চয়তার মাঝেও রমজান তাদের কাছে এসেছে আশা ও ধৈর্যের নতুন পরীক্ষা হিসেবে।
মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী এলাকায় থাকেন ৫২ বছরের মাইসুন আল-বারবারাউই। তাঁর ছোট তাঁবুতে এবার দুই ছেলেকে নিয়ে রমজান পালন করছেন। ক্লান্তি আর অভাবের মধ্যেও ছেলেদের জন্য একটা ছোট ফানুস কিনতে পেরে তিনি খুব খুশি। মাইসুনের কথায়, “সন্তানদের হাসিই এখন আমার সবচেয়ে বড় স্বস্তি।”
গত দুই বছরে যুদ্ধের তীব্রতায় গাজায় ৭০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। এখন নাজুক যুদ্ধবিরতি চললেও মাঝেমধ্যে গোলাবর্ষণের ঘটনা ঘটছে। মাইসুন বলেন, এটা তাদের গৃহহীন অবস্থায় টানা তৃতীয় রমজান। যুদ্ধ শুরুর সময় দক্ষিণ-পূর্ব গাজার বাড়ি হারিয়ে পরিবার নিয়ে এক শিবির থেকে আরেক শিবিরে ঘুরে শেষে বুরেইজে আশ্রয় নিয়েছেন। সীমিত সম্পদ নিয়ে ইফতারের আয়োজন নিয়েও তিনি অনিশ্চিত। তার একমাত্র প্রার্থনা—যেন যুদ্ধ আর না ফিরে আসে।
গাজাবাসীর অনেকেই আশঙ্কা করছেন, গত বছরের মতো এবারও রমজানের মধ্যেই যুদ্ধ তীব্র হয়ে উঠতে পারে। ২০২৫ সালের মার্চে রমজানের দ্বিতীয় সপ্তাহে লড়াই ফের শুরু হলে সীমান্ত বন্ধ হয়ে যায়, খাদ্য সহায়তা বন্ধ হয় এবং তীব্র দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনো তাজা।
জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, গাজায় অনেক পরিবার এখন পুরোপুরি মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
৫৫ বছরের হানান আল-আত্তারও তাদেরই একজন। রমজানের প্রথম দিনে তিনি একটা ত্রাণের প্যাকেট পেয়েছেন। এক বছর আগে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে দেইর আল-বালাহে পালিয়ে এসে এখন ১৫ জন স্বজন নিয়ে এক তাঁবুতে থাকেন। তার দুই ছেলে গত বছর বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছে। তাদের অনুপস্থিতি এই রমজানে তার বেদনাকে আরও গভীর করেছে।
বিদ্যুৎ আর অবকাঠামোর অভাবে হানান প্রতিদিন যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু খাবার কেনেন, কারণ সংরক্ষণের কোনো উপায় নেই। রান্নার গ্যাসের সংকটে দুই বছর ধরে খোলা আগুনে রান্না করছেন। দুর্ভিক্ষের সময় ডালের গুঁড়া দিয়ে রুটির বিকল্প বানাতেন, যাতে সবার জন্য খাবার জোটে।
সব প্রতিকূলতার মধ্যেও গাজার মানুষের একটাই প্রত্যাশা—শান্তি আর নিরাপত্তা। হানানের কথায়, “এই রমজান যেন সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো যেন আবার নিজেদের ঘরে ফিরতে পারে।”
