এক হাতের তালি বাজে না, তেমনি সঠিক নেতৃত্ব ছাড়া কোনো জাতি উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে না। বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে যদি কোনো একটি দেশ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা এবং কৌতূহল থাকে, তবে সেটি হলো চীন। পশ্চিমা মিডিয়াগুলো প্রায়ই চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নিয়ে নেতিবাচক খবর প্রচার করে। সম্প্রতি চীনের কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের কিছু রদবদল নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা মুখরোচক গল্পের জন্ম দিয়েছে তারা। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ কি আমরা দেখেছি? আজ আমরা বিশ্লেষণ করব কেন চীন এই ধরণের কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং কিভাবে এটি তাদের রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
সম্প্রতি আমরা সংবাদ শিরোনামে দেখেছি চীনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনেকে একে 'পরিশোধন' বা 'Purge' হিসেবে দেখলেও, গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায় এটি আসলে চীনের সামরিক বাহিনীকে দুর্নীতিমুক্ত এবং আরও পেশাদার করার একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং শুরু থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। একটি দেশের সেনাবাহিনী যদি ভেতর থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত থাকে, তবে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। চীন ঠিক এই জায়গাটিতেই আঘাত করেছে। জ্যাং ইউশিয়ার মতো কর্মকর্তাদের অপসারণ আসলে প্রমাণ করে যে, চীনের আইনে কেউ ঊর্ধ্বে নয়। এটি সামরিক বাহিনীর চেইন অফ কমান্ডকে আরও মজবুত এবং স্বচ্ছ করেছে।
একটি দেশ যখন পরাশক্তি হওয়ার পথে থাকে, তখন তার নেতৃত্বের ঐক্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। পশ্চিমা বিশ্লেষকরা একে 'ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ' বললেও, চীনের প্রেক্ষাপটে এটি 'দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা'। আপনি যদি গত এক দশকের চীনের উন্নতির দিকে তাকান, তবে দেখবেন তাদের অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং সামরিক শক্তি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মূল কারণ হলো একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কমান্ড। যখন পুরো দেশ এবং সামরিক বাহিনী এক সুরে কথা বলে, তখন যেকোনো আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবেলা করা সহজ হয়। জিংপিংয়ের এই সাহসী পদক্ষেপগুলো চীনকে একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রে পরিণত করেছে, যা বর্তমান অস্থির বিশ্বে অত্যন্ত বিরল।
ভিডিওর এই অংশে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমা অনেক মিডিয়া দাবি করছে যে চীনে নাকি সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু এই দাবির সপক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ আজও মেলেনি। বরং চীনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, এটি ছিল একটি নিয়মিত প্রশাসনিক সংস্কার। চীন কখনোই তার জাতীয় নিরাপত্তার গোপন তথ্য অন্যের হাতে যেতে দেয় না। তাই যখনই কোনো দুর্নীতির গন্ধ পাওয়া যায়, তখনই রাষ্ট্র কঠোর হয়। এটি চীনের জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতারই অংশ। ড্রাগনের এই কঠোরতা আসলে তার অভ্যন্তরীণ শত্রুদের বিনাশ করে দেশকে আরও নিরাপদ রাখছে।
চীনের এই সামরিক সংস্কারের পেছনে তাইওয়ান ইস্যুটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন। তাদের লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে পিপলস লিবারেশন আর্মি বা PLA-কে একটি বিশ্বমানের আধুনিক বাহিনীতে রূপান্তরিত করা। এই লক্ষ্য অর্জনে যারা বাধা হয়ে দাঁড়াবে বা যারা ব্যক্তিগত স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থের উপরে রাখবে, তাদের অপসারণ করা চীনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনারই অংশ। চীন বিশ্বাস করে, তাইওয়ান একদিন মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত হবেই, আর তার জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ অনুগত এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এক সামরিক বাহিনী।
অনেকেই মনে করেন সামরিক সংস্কার করলে হয়তো সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে হয়েছে ঠিক তার উল্টো। নতুন এবং উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তাদের সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে চীন তার বাহিনীতে 'নতুন রক্ত' বা 'New Blood' সঞ্চালন করছে। যারা শুধু যুদ্ধের ময়দানেই দক্ষ নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তিতেও পারদর্শী। চীন আজ বিশ্বের বৃহত্তম সক্রিয় সামরিক বাহিনীর দেশ। ২ মিলিয়নেরও বেশি দক্ষ সৈনিক এবং সর্বাধুনিক মিসাইল সিস্টেম চীনের সীমানাকে করেছে দুর্ভেদ্য। এটি কেবল ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং বিশ্বশান্তি রক্ষায় চীনের শক্তিশালী অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ।
শেষে বলা যায়, চীন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলছে। পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচনা সত্ত্বেও চীন প্রমাণ করেছে যে, একটি শক্তিশালী এবং সুশৃঙ্খল নেতৃত্বই পারে একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে। চীনের এই কঠোর প্রশাসনিক সংস্কার আসলে তাদের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার এক মজবুত ভিত্তি। যারা চীনকে ভেতর থেকে দুর্বল ভাবছেন, তারা হয়তো ড্রাগনের আসল শক্তি পরিমাপ করতে ভুল করছেন। বেইজিং এখন শুধু এশিয়ার পরাশক্তি নয়, বরং বিশ্ব ব্যবস্থার এক অপরিহার্য স্তম্ভ।
দর্শক, আপনার কী মনে হয়? চীনের এই শক্তিশালী প্রশাসনিক ব্যবস্থা কি তাদের আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে? কমেন্ট করে আমাদের জানান।
