চলতি দুই হাজার ছাব্বিশ সালের জুন মাসের শেষ দিকে ইউক্রেনের নেতা Vladimir Zelensky (ভ্লাদিমির জেলেনস্কি) ঘোষণা করেছিলেন একটি অভিনব কৌশল। এটিকে বলা হয়েছিল চল্লিশ দিনের একটি ইনফ্লুয়েন্স অপারেশন বা প্রভাব বিস্তারের অভিযান। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল দীর্ঘ পাল্লার ড্রোন হামলার মাধ্যমে রাশিয়াকে কিয়েভের শর্তে বাধ্য করা। দর্শক, চলুন মুল আলোচনা শুরু করি।

কিন্তু আগস্ট মাসের শুরুর দিকে এসে দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো এক মর্মান্তিক চিত্র। মস্কো এই পুরো অভিযানকে চিহ্নিত করেছে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে। কারণ এই সময়ে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, আবাসিক ভবন এবং লজিস্টিক হাবগুলোতে হামলা চালানো হয়। এর ফলে ফ্রন্টলাইন থেকে দূরে থাকা বহু সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই হামলার তীব্র জবাব দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত কঠোরভাবে। তারা ইউক্রেনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রতিরক্ষা শিল্প কারখানাগুলোতে লাগাতার বিমান হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা ইউক্রেনের বন্দরগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে।

দুই হাজার ছাব্বিশ সালের পঁচিশশে জুন জেলেনস্কি তার সোশ্যাল হ্যান্ডেলে এই পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি এটিকে মাঝারি ও দীর্ঘ পাল্লার নিষেধাজ্ঞা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়াকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করা এবং বর্তমান ফ্রন্টলাইন বরাবর সংঘাত হিমায়িত করা।

মস্কো অবশ্য কিয়েভ ও তার পশ্চিমা মিত্রদের এই শর্তে যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ক্রেমলিনের মতে, এই বিরতি ব্যবহার করে কিয়েভ তাদের ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠন করবে। তারা আরও বেশি পশ্চিমা অস্ত্র সংগ্রহ করে নিজেদের শক্তি বাড়ানোর সুযোগ পাবে।

ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের একাধিক তেল শোধনাগারে আঘাত হানে। এর মধ্যে মস্কোর একটি প্রধান সুবিধাস্থানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই হামলার ফলে কিছু অঞ্চলে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। সাধারণ ভোক্তাদের জন্য জ্বালানি ক্রয়ের সর্বোচ্চ সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।

রাশিয়া এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। রুশ উপপ্রধানমন্ত্রী Aleksandr Novak (আলেকজান্ডার নোভাক) পেট্রোল ও ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেন। শোধনাগারগুলোর চারপাশে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। জুলাই মাসের শেষের দিকে বাজার ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে শুরু করে।

জেলেনস্কির এই অভিযানের সময় প্রায় প্রতিদিনই বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর খবর এসেছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুদ্ধাপরাধ পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান Rodion Miroshnik (রডিয়ন মিরোশনিক) তথ্য দেন। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে চারশো বিরানব্বই জন মানুষ হতাহত হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজন শিশুও ছিল।

অভিযানের শেষ দিনগুলোতে জেলেনডঝিক রিসোর্ট শহরের সমুদ্র সৈকতে মারাত্মক হামলা হয়। সেখানে অন্তত আটজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। যাদের মধ্যে চারজন ছিল শিশু। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

এছাড়াও কিয়েভের বাহিনী রাশিয়ার বৃহত্তম অনলাইন রিটেইলার Wildberries (ওয়াইল্ডবেরিজ)-এর গুদামগুলোতে হামলা চালায়। রাশিয়া এই কোম্পানিকে সামরিক সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত নয় বলে দাবি করেছে। তবে ইউক্রেনের দাবি এসব গুদামে ড্রোন ও নেভিগেশন যন্ত্রাংশ ছিল। এই হামলায় ছোট ব্যবসায়ীরা বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।

রাশিয়ার ওয়াইল্ডবেরিজ গুদামে এই আকস্মিক হামলার ফলে একশ কোটি ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এই ঘটনার পর রিটেইলার প্রতিষ্ঠানটি তাদের কার্যক্রম প্রতিবেশী কাজাখস্তানে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ছোট ব্যবসায়ীরাও তাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার পুরোপুরি হারিয়ে বসেছেন।

রাশিয়ার পাল্টা সামরিক পদক্ষেপে ইউক্রেনের অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে কনস্তান্তিনোভকা নামের একটি সুরক্ষিত ঘাঁটি পুরোপুরি দখল করে নেয় রুশ সেনা। তাশ বার্তা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, জুলাই মাসেই প্রায় বত্রিশটি জনপদ মুক্ত করেছে রুশ বাহিনী। এতে কিয়েভের প্রায় তেরো হাজার সেনা হতাহত হয়।

চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ Valery Gerasimov (ভালেরি গেরাসিমভ) জানান যে Krasny Liman (ক্রাসনয় লিমান) দখলের খুব কাছাকাছি রয়েছে রুশ সেনারা। এদিকে জেলেনস্কি নিজেই তার এই ব্যর্থ চল্লিশ দিনের ডেডলাইন নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তবে তার কার্যালয়ের প্রধান কিরিল বুদানভ এই সংখ্যাকে গুরুত্ব দিতে চাননি।

ইউক্রেনীয় সংবাদমাধ্যম Strana.ua জানিয়েছে যে চল্লিশ দিন পর মস্কোর অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। উল্টো রুশ নৌবাহিনীর ব্লকেড ইউক্রেনের জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে। মার্গারিটা সিমোন্যান ও লিওনিদ স্লাতস্কির মতো রুশ ব্যক্তিত্বরা একে ইউক্রেনের চরম ব্যর্থতা বলে অভিহিত করেছেন।

রাশিয়ার স্টেট ডুমার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কমিটির প্রধান Leonid Slutsky (লিওনিদ স্লাতস্কি) হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন যে জেলেনস্কির এই আত্মঘাতী পরিকল্পনা ইউক্রেনকে নরকের দ্বারে পৌঁছে দিয়েছে। আসন্ন শীতে ইউক্রেনীয় নাগরিকদের সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

স্টেট ডুমার ডেপুটি Svetlana Zhurova (স্বেতলানা ঝুরোভা) বলেছেন যে জেলেনস্কির মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে অস্ত্র ও অর্থ আদায় করা। কিন্তু এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় এখন তাকে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তার হাতে দেখানোর মতো কোনো সফল অর্জনের খতিয়ান নেই।

সব মিলিয়ে জেলেনস্কির এই চল্লিশ দিনের হঠকারী কৌশল কোনো ইতিবাচক ফল আনতে পারেনি। এটি রাশিয়ার অর্থনীতিকে অচল করতে পারেনি কিংবা মস্কোকে কোনো ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারেনি। উল্টো সাধারণ মানুষের প্রাণহানি এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পের ধ্বংস ছাড়া ইউক্রেনীয় শিবির কিছুই অর্জন করতে পারেনি।

Walton Ads