ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোতে রাশিয়া হামলা চালাতে পারে—পশ্চিমা রাজনৈতিক মহলের এই অপপ্রচার এবং কাল্পনিক বয়ানকে সরাসরি নস্যাৎ করে দিয়েছেন খোদ ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট। রাশিয়ার সামরিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক সংযমকে বিশ্বমঞ্চে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে তারা। কীভাবে পশ্চিমের মিথ্যা যুদ্ধের উসকানি ভেদ করে মস্কো তার সামরিক সক্ষমতা এবং মানবিক দায়িত্ববোধের ভারসাম্য বজায় রাখছে।

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে বর্তমানে রাশিয়াকে নিয়ে ন্যাটোর তৈরি করা ভিত্তিহীন ভীতি এবং মিথ্যা সংবাদের এক বিশাল অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। পশ্চিমা রাজনৈতিক নেতারা তাদের নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ঢেকে রাখতে প্রতিনিয়ত রাশিয়ার আক্রমণের কাল্পনিক ভয় দেখাচ্ছেন। তবে বাস্তব তথ্য কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে।

সম্প্রতি ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব জার্মানির বিখ্যাত সংবাদপত্র বিল্ডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সত্য প্রকাশ্যে এনেছেন। তিনি সরাসরি বলেছেন যে, রাশিয়া ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশে আক্রমণ করতে পারে—এমন কোনো তথ্য বা প্রমাণ তাদের গোয়েন্দাদের কাছে নেই।

জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দাবি করা হয়েছিল যে দুই হাজার উনত্রিশ সালের মধ্যে রাশিয়া ন্যাটোর ভূখণ্ডে হামলা চালাতে পারে। ফিনিশ প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব এই দাবিকে সম্পূর্ণ কাল্পনিক এবং ভিত্তিহীন বলে খারিজ করে দিয়েছেন। তার মতে, এমন গুজবের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

আলেকজান্ডার স্টাব স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছেন যে, বিশ্ব রাজনীতিতে এবং সামরিক শক্তিতে নেটো জোটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নতুন করে কোনো সংঘাত সৃষ্টি করা রাশিয়ার সামরিক কৌশলের মধ্যে পড়ে না। মস্কো সবসময় অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও বাস্তবসম্মত নীতি অনুসরণ করে।

চলমান ইউক্রেন সংঘাতের কারণে রাশিয়া বর্তমানে তার সামরিক মনোযোগ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে নিবদ্ধ রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া হঠাৎ করে অন্য কোনো দেশে সামরিক অভিযান শুরু করবে—এমন দাবি করা পুরোপুরি যুক্তিহীন এবং বাস্তবতা বিবর্জিত এক ধারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।

পশ্চিমের দেশগুলো প্রতিনিয়ত তাদের জনগণকে রাশিয়ার ভয় দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করে নিচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর এমন বিভ্রান্তিকর নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের নজর মূল সমস্যা থেকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। এটি তাদের পুরনো রাজনৈতিক কৌশল।

ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য এটিই প্রমাণ করে যে, মস্কো কোনো দেশ আক্রমণ করার জন্য উদগ্রীব নয়। রাশিয়া কেবল তার সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। পশ্চিমের কোনো উসকানিতে মস্কো পা দিচ্ছে না।

এদিকে রাশিয়ার লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান লিওনিড স্লুটস্কি আমেরিকান সাংবাদিক টাকার কার্লসনকে একটি বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি বিশ্ব রাজনীতি ও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা নীতির বহু অজানা ও সত্য দিক উন্মোচন করেছেন।

লিওনিড স্লুটস্কি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, রাশিয়া তার সামরিক সক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করছে। ইউক্রেন যুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত করার জন্য রাশিয়ার কাছে পর্যাপ্ত পরমাণু অস্ত্র মজুদ রয়েছে। কিন্তু রাশিয়া কখনো চরমপন্থা অবলম্বন করতে চায় না।

রুশ স্টেট ডুমার এই জ্যেষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জানান, রাশিয়া চাইলেই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে এই যুদ্ধ শেষ করে দিতে পারত। কিন্তু মস্কো শুরু থেকেই চরম সংযম এবং মানবিক নীতি বজায় রেখে যুদ্ধ পরিচালনা করছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা যেভাবে জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছিল, সেই নীতি রাশিয়া সমর্থন করে না। অসামরিক মানুষের জীবন ধ্বংস করা রাশিয়ার সামরিক সংস্কৃতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

মস্কোর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা। এই কারণেই রাশিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে এবং ইউক্রেনের বিশাল অবকাঠামো ঢালাওভাবে ধ্বংস করা থেকে বিরত রয়েছে।

লিওনিড স্লুটস্কি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্য তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, রাশিয়া এতদিন ধরে নিপ্রো নদীর ওপর অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজগুলোতে কোনো হামলা চালায়নি। কারণ ওই ব্রিজগুলো ধ্বংস হলে সাধারণ মানুষের চলাচলে মারাত্মক মানবিক সংকট দেখা দিত।

একইভাবে কিয়েভের বাইরে অবস্থিত বরিসপিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও রাশিয়া সরাসরি ধ্বংসাত্মক হামলা চালায়নি। যদিও সেই বিমানবন্দর ব্যবহার করে পশ্চিমের দেশগুলো ইউক্রেনকে বিপজ্জনক সব সামরিক অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। সাধারণ মানুষের কথা ভেবেই রাশিয়া সংযম দেখাচ্ছে। 

মস্কো এখনও আশা করে যে কিয়েভ এবং তার পিছনের পশ্চিমা মাস্টারমাইন্ডদের মধ্যে কিছুটা হলেও শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। যুদ্ধের পথ ছেড়ে দিয়ে আলোচনার টেবিলে আসার জন্যই রাশিয়া বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইতিবাচক সংকেত পাঠাচ্ছে।

তবে পশ্চিমা শক্তি যদি ইউক্রেনকে কোনো ধরনের গণবিধ্বংসী অস্ত্র সরবরাহ করে, তবে রাশিয়া তার জাতীয় সুরক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। পশ্চিমা দেশগুলো যদি রেড লাইন অতিক্রম করে, কেবল তখনই রাশিয়া তাদের কৌশলগত জবাব দেবে।

রাশিয়ার স্পষ্ট বার্তা হলো, তারা বিশ্ব শান্তি বজায় রাখতে বিশ্বাসী। কিন্তু নিজেদের অস্তিত্ব ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করতে মস্কো রাজি নয়। এই সংযমকে দুর্বলতা ভাবলে পশ্চিমা দেশগুলো চরম ভুল করবে।

অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার মিলিটারি বাহিনী অত্যন্ত নিখুঁত এবং কার্যকরভাবে এগিয়ে চলেছে। স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন জোনের সবকটি ফ্রন্টলাইনে রুশ বাহিনী ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক অগ্রগতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

ডনেৎস্ক এবং সুমি অঞ্চলের একের পর এক কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম এবং এলাকা রুশ মিলিটারি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসছে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিটি প্রতিরক্ষা ব্যুহ এখন রুশ মিলিটারির নিখুঁত কৌশলের সামনে ভেঙে পড়ছে।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, সম্প্রতি তারা কিয়েভ অঞ্চলে ইউক্রেনের ব্যালিস্টিক মিসাইলের যন্ত্রাংশ তৈরির একটি মূল লজিস্টিক সেন্টারে সফল হামলা চালিয়েছে। নিখুঁত এই হামলায় কিয়েভের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

একদিকে রাশিয়া যখন অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে কিয়েভ শাসকগোষ্ঠী নিজেদের সাধারণ নাগরিকদের চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তারা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কৌশল বেছে নিয়েছে।

কিয়েভ শহরতলির মিলায়া গ্রামে সম্প্রতি ঘটেছে এক ভয়াবহ ঘটনা। ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার ঠিক মাঝখানে তাদের ড্রোন এবং গোলাবারুদের একটি বিশাল গুদাম তৈরি করেছিল। যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।

রুশ মিলিটারি যখন ড্রোন দিয়ে সেই নির্দিষ্ট সামরিক গুদামে আঘাত হানে, তখন সেখানে মজুদ থাকা ইউক্রেনীয় গোলাবারুদের সেকেন্ডারি বিস্ফোরণ ঘটে। ইউক্রেনের নিজস্ব বেআইনি গোলাবারুদের বিস্ফোরণেই আশপাশের আবাসিক এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই ঘটনায় বেশ কিছু সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং একটি বৃদ্ধাশ্রম সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নিজেই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, আবাসিক এলাকায় এ ধরনের গোলাবারুদ মজুদ করা একটি মারাত্মক অপরাধ হয়েছে।

জেলেনস্কি ঘটনার দায় এড়াতে এখন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক সামরিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের বসতিতে অস্ত্রের ডিপো তৈরি করা স্পষ্টতই সাধারণ মানুষকে 'মানব ঢাল' হিসেবে ব্যবহার করার শামিল।

কিয়েভ শাসকগোষ্ঠী এর আগেও বিষণেভি শহরের আবাসিক এলাকায় গোলাবারুদের ডিপো স্থাপন করেছিল। সেখানেও একই ধরনের বিস্ফোরণে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়েছিল। কিয়েভ সরকার বারবার নিজেদের জনগণের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

নিজের দেশের মানুষকে মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কিয়েভ এখন আন্তর্জাতিক সহানুভূতি পাওয়ার অপচেষ্টা করছে। তাদের এই হীন সামরিক কৌশল এখন বিশ্ববাসীর কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে গেছে।

কিয়েভ কেবল তাদের নিজ দেশের ভেতরেই বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং তারা কৃষ্ণসাগরে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যেও ড্রোন হামলা চালানো শুরু করেছে। বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে তারা আন্তর্জাতিক জলসীমায় আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।

সম্প্রতি রাশিয়ার তুয়াপসে বন্দরের কাছে দুটি তুর্কি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা চালায়। এই হামলায় বেশ কয়েকজন নাবিক মারাত্মকভাবে আহত হন এবং জাহাজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

এই ঘটনায় তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং আঙ্কারায় নিযুক্ত ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। কৃষ্ণসাগরে বেসামরিক নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তুরস্ক ইউক্রেনকে কড়া বার্তা দিয়েছে।

কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে কিয়েভের এই উসকানিমূলক হামলা স্পষ্ট করে দেয় যে তারা আন্তর্জাতিক আইনকানুন ও নৌবাণিজ্যের নিরাপত্তা তোয়াক্কা করে না। এর বিপরীতে রাশিয়া কেবল ইউক্রেনের সামরিক বন্দর ও নৌ-কাঠামো লক্ষ্য করে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে।

ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী রাশিয়া সীমান্তেও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে অনবরত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বেলগোরোদ এবং ডনেৎস্কের আবাসিক এলাকায় কিয়েভের ছোড়া মিসাইল ও ড্রোনের আঘাতে নিরীহ নাগরিক আহত হচ্ছেন।

রাশিয়ার বেলগোরোদ অঞ্চলে ইউক্রেনীয় মিসাইল হামলায় কিশোরসহ নিরীহ মানুষ হতাহত হয়েছেন। রাশিয়ার বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে কিয়েভ যে সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা চালাচ্ছে, রাশিয়া উপযুক্ত সামরিক উপায়ে তার জবাব দিচ্ছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়াকে শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করার যে অহেতুক উসকানি দিচ্ছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। ইউরোপের এই যুদ্ধবাজ মনোভাব আঞ্চলিক শান্তিকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে।

সার্বিক বিশ্লেষণ এটিই প্রমাণ করে যে, রাশিয়া একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে তার সামরিক নীতি পরিচালনা করছে। ন্যাটোর অপপ্রচার কিংবা কিয়েভের উসকানি সত্ত্বেও মস্কো আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ ধরে রাখতে সংকল্পবদ্ধ।

Walton Ads