নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরাও ইতোমধ্যে শপথ নিয়েছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের পথচলা শুরু হতেই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্ন—এই সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি কে হবেন, আর কবে হবে নির্বাচন?
সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ ২০২৮ পর্যন্ত
শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব নেওয়া তার মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তার পদত্যাগের দাবি ওঠে ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে। তবে শুরু থেকেই তাকে অপসারণের বিরোধিতা করে আসছিল বিএনপি। শেষ পর্যন্ত তার কাছেই তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার শপথ নেয়।
আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য না হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্ভব নয়। অর্থাৎ তিনি যদি পদত্যাগ না করেন কিংবা অভিশংসনের মুখে না পড়েন, তাহলে নতুন কেউ শপথ নিতে পারবেন না।
সংবিধান বিশ্লেষক ও আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, সংবিধানে পরিষ্কারভাবে বলা আছে রাষ্ট্রপতির পদ কিভাবে শূন্য হবে। পদ শূন্য হলেই কেবল নতুন সংসদ এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
পদ শূন্য হওয়ার তিন কারণ
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুইবার দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
রাষ্ট্রপতির পদ তিন কারণে শূন্য হতে পারে—
মেয়াদ শেষ হওয়া
পদত্যাগ
অভিশংসন
২০২৪ সালের অক্টোবরেও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন।
গত ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি সরে যেতে চান। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনি ‘অপমানিত বোধ’ করছেন। তবে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন বলেও উল্লেখ করেন।
এবার কী হতে পারে?
মঙ্গলবার সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন। নতুন সংসদে শিগগিরই স্পিকার দায়িত্ব নেবেন। রাষ্ট্রপতি যদি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন, তাহলে অভিশংসনের প্রয়োজন হবে না। বিশ্লেষকদের ধারণা, যেহেতু তিনি আগেই সরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, সেক্ষেত্রে বড় কোনো জটিলতা হওয়ার কথা নয়।
নতুন সরকার ও সংসদ দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতির পরিবর্তনের প্রশ্নটি সামনে আসতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন যেভাবে
সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন এবং দুইবারের বেশি দায়িত্বে থাকতে পারেন না।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে এবং সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে।
১৯৯১ সালে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার পর সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান বাতিল হয়। বর্তমানে সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে নির্বাচন পরিচালনা করেন। স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল ঘোষণা করা হয়। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মেয়াদ শেষজনিত কারণে পদ শূন্য হলে মেয়াদ শেষের আগের ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে।
আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে দুইজন সংসদ সদস্য প্রয়োজন—একজন প্রস্তাবক, একজন সমর্থক। একক প্রার্থী হলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয় না।
তফসিল ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশন চলাকালীন সময়ে ভোট হয়। অধিবেশন না থাকলে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তত সাতদিন আগে অধিবেশন আহ্বান করে ভোটের ব্যবস্থা করে।
সব মিলিয়ে, বিএনপি সরকারের যাত্রা শুরুর পর এখন সবার নজর রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে। পদত্যাগ, নাকি মেয়াদ পূর্ণ হওয়া—কোন পথে এগোবে পরিস্থিতি, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
