ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয়ের পর এখন বিএনপির নজর সংরক্ষিত নারী আসনের দিকে। সাধারণ নির্বাচনে ২০৯টি আসনে জয় পাওয়ায় ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে ৩৫টিই পাবে দলটি। আর এই ৩৫টি আসনকে ঘিরে শুরু হয়েছে তুমুল দৌড়ঝাঁপ। বিএনপির শতাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী ইতোমধ্যে তাদের অবস্থান শক্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

জানা গেছে, মনোনয়নপ্রত্যাশী নেত্রীরা ঢাকায় অবস্থান করে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। কে কোন আসনে মনোনয়ন পাচ্ছেন, তা নিয়ে দলের অভ্যন্তরে চলছে জোর আলোচনা। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যে দলের হাইকমান্ড থেকে আসবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এখন সবার নজর সেই ঘোষণার দিকেই।

সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে ৫০টি নারী আসন সংরক্ষিত রয়েছে। আরপিও অনুযায়ী, সাধারণ আসনে কোনো দল যতটি আসন পায়, সেই অনুপাতে এই সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়। এছাড়া স্বতন্ত্র (বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত) প্রার্থীরা সাতটি আসন পেয়েছেন। ফলে তারাও একটি সংরক্ষিত নারী আসন পেতে পারেন।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বুধবার গণমাধ্যমকে জানান, সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন রোজার মধ্যে করার পরিকল্পনা চলছে। ঈদের আগেই এ নির্বাচনের যাবতীয় কার্যক্রম শেষ করতে চায় ইসি। সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন বাধ্যতামূলক।

বিএনপি সূত্রে জানা যায়, এবারের সাধারণ নির্বাচনে অন্তত ৫০টি আসনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন বিএনপির নেত্রীরা। কয়েকজন ছাড়া বেশির ভাগ নেত্রীই এবার মনোনয়ন পাননি। ফলে তাদের অনেকেই এখন সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন।

কে কে আছেন আলোচনায়?

বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আকতার জাহান শিরিন, দলটির কেন্দ্রীয় নেত্রী শিরিন সুলতানা, মহিলা দলের বর্তমান সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, মহিলা দলের সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, সহসভাপতি নাজমুন নাহার বেবী, সাবেক এমপি শাম্মী আকতার, নিলোফার চৌধুরী মনি, আসিফা আশরাফী পাপিয়া, রাশেদা বেগম হীরা, রেহেনা আকতার রানু, ইয়াসমিন আরা হক, জাহান পান্না, বিলকিস ইসলাম, ফরিদা ইয়াসমিন।

এছাড়া কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনিন, রিজিয়া পারভিন ও কনক চাঁপা এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসিম উদ্দিন মওদুদের নামও আলোচনায় আছে।

ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, বিএনপি নেত্রী অপর্ণা রায়, অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, মহিলা দলনেত্রী শাহানা আকতার সানু, নিয়াজ হালিমা আর্লি, রাবেয়া আলম, ঝালকাঠি জেলা বিএনপি নেত্রী জেবা আমিন খান, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, ময়মনসিংহ জেলা মহিলা দলের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেত্রী তানজিন চৌধুরী লিলি, ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আরা উর্মি ও শাহিনুর সাগর।

মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম (তুলি), স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মরহুম শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হুসাইন, ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী, সিলেটের সাবেক সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ মকবুল হোসেনের মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেনের নামও আলোচনায় আছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী ও সাবেক এমপি হাসিনা আহমদ আলোচনায় রয়েছেন।

চট্টগ্রামের সম্ভাবনাময় নেত্রীরা

বিএনপির সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ফাতেমা বাদশা, চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা দলের সভাপতি মনোয়ারা বেগম মনি ও সাধারণ সম্পাদক জেলী চৌধুরী, উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতি মেহেরুন নেছা নার্গিস, দক্ষিণ জেলা মহিলা দলের সভাপতি জান্নাতুল নাঈম রিকু, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক কাউন্সিলর জেসমিনা খানম, জাসাসের কেন্দ্রীয় নেত্রী নাজমা সাঈদ ও ফটিকছড়ির গুম হওয়া বিএনপি নেতা শহিদুল আলম সিরাজ চেয়ারম্যানের সহধর্মিণী সুলতানা পারভীন।

চট্টগ্রাম নগর মহিলা দলের সহ-সভাপতি জেসমিনা খানম বলেন, 'দীর্ঘ ১৭ বছর মামলা-হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছি, কিন্তু দল ছেড়ে যাইনি। নারী হয়েও বাসায় থাকতে পারিনি। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়লাভ করেছি। দল যদি নারীদের মূল্যায়ন করে, তাহলে চট্টগ্রামে অনেক নারী নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসবে।'

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আকতার জাহান শিরিন যুগান্তরকে বলেন, 'ছাত্রদল দিয়ে রাজনীতি শুরু। এরপর নানা প্রতিকূলতা পেরিয়েছি। আজীবন দলের জন্য কাজ করেছি। অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। জেল-জুলুমসহ নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছি। ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছি। এখন দল যদি আমাকে উপযুক্ত (সংরক্ষিত আসনে) মনে করে, তাহলে দলের সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত হবে। আশা করি, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সবাইকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করবেন।'

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য যুগান্তরকে বলেন, 'প্রাপ্ত আসনের বিপরীতে ৩৫টি সংরক্ষিত নারী আসন পাবে বিএনপি। নির্বাচন কমিশনের তফশিল অনুযায়ী আমাদের দলীয় মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হবে। বিএনপিতে অসংখ্য যোগ্য নেত্রী রয়েছেন। তারা দৌড়ঝাঁপ চালিয়ে যাচ্ছেন। সবকিছু বিবেচনা করেই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্ধারণ করবেন কারা সংরক্ষিত নারী আসনে যাবেন। তবে এবার তরুণ নেত্রীদের মূল্যায়নের সম্ভাবনা বেড়েছে।'

 

news