বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০২৪ সালের অগাস্ট ছিল টার্নিং পয়েন্ট। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রশাসন থেকে সুপ্রিম কোর্ট—সবখানেই পরিবর্তনের ঢেউ লাগে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কীভাবে পদে বহাল থাকলেন—এই প্রশ্নই তখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কমপক্ষে দুই দফা বঙ্গভবন ঘেরাও, পদত্যাগের দাবি, এমনকি ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টাও হয়েছিল। তবু শেষ পর্যন্ত তিনি টিকে যান। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনিই নতুন প্রধানমন্ত্রীর শপথ পড়ান।

নিজেই জানালেন টিকে থাকার রহস্য

ঢাকার দৈনিক কালer কণ্ঠ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।”

তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকেও তাকে অপসারণের চেষ্টা হয়েছিল। এমনকি রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং বন্ধ করে দেওয়া এবং বিদেশ সফর শেষে নিয়ম অনুযায়ী তাকে অবহিত না করার অভিযোগও তোলেন।

বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে তার ছবি নামানো নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তবে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের এক সদস্য এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি।

কীভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন সাহাবুদ্দিন?

২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তিনি। ২৪ এপ্রিল শপথ নেন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।

কেন অনড় ছিল বিএনপি?

রাষ্ট্রপতির অপসারণের দাবি উঠলেও বিএনপির সিনিয়র নেতারা প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল—রাষ্ট্রপতি অপসারণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে, সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে এবং নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা জানেন না বলে মন্তব্য করেন।

আরেকজন স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁদের অবস্থান ছিল—রাষ্ট্রপতি ইস্যু যেন দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতায় সংকট তৈরি না করে। শেখ হাসিনার পতনের পর সবকিছু যখন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় হচ্ছিল, তখন অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে সরানো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি শুরু থেকেই দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে ছিল। রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে যাক—তা তারা চায়নি। কারণ দ্রুত নির্বাচন হলে তারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারবে বলে দলটি মনে করেছিল।

বিক্ষোভ, অবরোধ ও উত্তেজনা

১৯ অক্টোবর এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি শুনেছেন শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন, তবে তার কাছে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। এই মন্তব্যের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

২২ অক্টোবর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গণজমায়েত হয়। বঙ্গভবনের সামনে অবস্থান নেয় বিভিন্ন সংগঠন। রাতের দিকে ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টাও হয়। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

রাষ্ট্রপতি দাবি করেন, তখন বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতারা তাকে আশ্বস্ত করেন—তারা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চান এবং কোনো অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতি অপসারণের পক্ষে নন।

তিনি আরও জানান, তিন বাহিনীর পক্ষ থেকেও তাকে সমর্থন দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের বক্তব্য ছিল—রাষ্ট্রপতি পরাজিত হওয়া মানে সশস্ত্র বাহিনীর পরাজয়, যা তারা হতে দেবে না।

তারেক রহমান নিয়ে মন্তব্য

রাষ্ট্রপতি সাক্ষাৎকারে বিএনপি চেয়ারপারসনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে বলেন, শুরুতে তাঁর মনে কৌতূহল থাকলেও পরে তিনি বুঝেছেন, তারেক রহমান আন্তরিক।

রাষ্ট্রপতির ভাষায়, “আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।”

সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের অস্থির সময়ে রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমঝোতা ও সাংবিধানিক যুক্তির পথেই থেমে যায়। আর সেই প্রেক্ষাপটে বিএনপির অবস্থানই হয়ে ওঠে মো. সাহাবুদ্দিনের টিকে থাকার বড় ভিত্তি।

 

news