হরিয়ানার গুরগাঁও ছেড়ে কেন পালাচ্ছে মুসলমান অভিবাসী শ্রমিকরা?
হরিয়ানার সাম্প্রতিক দাঙ্গার পরে গত এক সপ্তাহে নূহ আর গুরগাঁও থেকে বহু মুসলমান চলে গেছেন। এঁদের একটা বড় অংশই পশ্চিমবঙ্গ আর বিহার থেকে যাওয়া অভিবাসী শ্রমিক। এরা বলছেন, প্রথমে নূহ্-তে দাঙ্গা, তারপরে গুরগাঁও আর লাগোয়া মসজিদে হামলা, এক ইমামের হত্যা এবং সবশেষে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি সব মিলিয়ে গুরগাঁওকে নিরাপদ বলে মনে করছেন না এই মুসলমানরা। তবে পশ্চিমবঙ্গ বা বিহার থেকে যাওয়া আরও বহু শ্রমিক এখনও গুরগাঁওতেই রয়ে গেছেন।
“গুরগাঁওয়ের যে মসজিদের নায়েব ইমাম মুহম্মদ শাদকে দাঙ্গাকারীরা হত্যা করেছিল পয়লা আগস্ট রাতে, সেই মসজিদের কাছেই আমার বাসা। খবরটা পাওয়ার পরে সারা রাত ঘুমোতে পারি নি,” বিবিসি প্রতিনিধিকে জানাচ্ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বুনিয়াদপুর অঞ্চলের আদি বাসিন্দা ওই মুসলমান ব্যক্তি । বেশ কয়েকটা দিন আতঙ্কের মধ্যে কাটিয়ে শেষমেশ পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন ওই ব্যক্তি।
ফিরে আসার সিদ্ধান্তটা অবশ্য সহিংসতার দিনেই নিয়ে ফেলেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার বাসিন্দা গাড়ি চালক জাকির। “ওই মসজিদেই তো নিয়মিত নামাজ পড়তে যেতাম। ঘটনার দিন রাত সাড়ে নয়টার দিকে নামাজ পড়ে বাসায় ফিরি, আর রাত তিনটে নাগাদ ফোন পাই যে এত বড় ঘটনা হয়ে গেছে মসজিদে। “সেদিনই রাত সাড়ে আটটা নয়টা নাগাদ ট্যাক্সি নিয়ে দিল্লি এসে বাড়ি ফেরার ট্রেন ধরি,” জানাচ্ছিলেন জাকির।
৫৫-৫৬ সেক্টরের ঘাটাগাঁওতে থাকেন পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার বাসিন্দা জুল হাসান। আতঙ্কে থাকলেও তিনি এলাকা ছাড়েন নি। তবে তিনি জানান, আমাদের এই জুগ্গি-ঝোপড়ির (বস্তিকে দিল্লি অঞ্চলে জুগ্গি-ঝোপড়ি বলা হয়) বহু বাঙালি-বিহারী ফিরে গেছে। হাজার দুয়েক মানুষ থাকে এখানে, এখন রয়েছে তিন-চারশো লোক।
গত এক সপ্তাহে গুরগাঁওয়ের বাসিন্দা এত বাঙালি শ্রমিক দিল্লি স্টেশন থেকে ট্রেন ধরেছেন, যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণ দিনাজপুরের ওই ব্যক্তি বলছিলেন, “স্টেশনে এত বাঙালী যে কোথাও কোনও হিন্দি কথাই শোনা গেল না। সবাই তো বাংলায় কথা বলছে। তাহলেই বুঝে নিন যে কত মানুষ প্রতিদিন ফিরে আসছে।“
এই দু'জনকে সরাসরি গুরগাঁও ছাড়ার হুমকি দেয় নি কেউ, তবে মসজিদে হামলা আর নায়েব ইমামকে হত্যার কদিন পরেই গুরগাঁওয়ের সেক্টর ৭০-এ বিবিসি হিন্দির সংবাদদাতা সেরাজ আলির সঙ্গে দেখা হয়েছিল আকলিমা নামে এক নারীর, যাকে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা সরাসরি শহর ছাড়ার হুমকি দিয়েছিল। আকলিমা জানিয়েছিলেন, “ওরা জিজ্ঞাসা করেছিল যে আমি হিন্দু না কি মুসলমান। আমি তাদের জানাই যে আমি মুসলমান, তখনই তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা আমাকে বলে যে শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে বিকাল চারটের মধ্যে।“
ওই সেক্টর ৭০-এ অভিবাসী শ্রমিক বস্তিগুলিতে গিয়ে এলাকা ছাড়ার হুমকি দিয়েছিল বলে বিবিসি হিন্দি জানতে পেরেছে।
এক পুলিশ কর্মকর্তা বিবিসি হিন্দিকে জানিয়েছেন, “কেউই এলাকা ছেড়ে যান নি, সবাই নিজের জায়গাতেই আছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলাকায় টহল বাড়ানো হয়েছে।“
এসব জায়গায় ‘হাউসকিপিং’ বা সাফাইয়ের এর কাজ করেন মূলত অভিবাসী শ্রমিকরাই। আবার অনেক ছোট বড় দোকানেও মূল চালিকা শক্তি শ্রমিকরাই। এর ফলে সমস্যায় পড়ছে অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আর আবাসিক কমপ্লেক্সগুলো।
গুরগাঁওয়ের যে সেক্টর ৭০এ মুসলমানদের এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে বিবিসি জানতে পেরেছিল, সেই অঞ্চলেরই একটি বহুতল আবাসিক কমপ্লেক্সের রেসিডেন্টস্ ওয়েলফেয়ার কমিটি (আরডব্লিউএ) বা অধিবাসী উন্নয়ন সমিতির সভাপতির একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে তিনি বলছেন যে তাদের সাফাই-কর্মীরা আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন, ফলে আবাসনের জঞ্জাল পরিষ্কার করার লোক নেই।
দ্য কুইন্ট’ সংবাদ পোর্টাল একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে তাদের প্রতিবেদনে, যেখানে একটি জনপ্রিয় সেলুন তার গ্রাহকদের কাছে মেসেজ পাঠিয়ে বলেছে যে ‘সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে’ তারা কর্মী স্বল্পতার সমস্যায় পড়েছে। ওই সেলুনের মালিকদের একজন ‘দ্য কুইন্ট’কে জানিয়েছেন যে তাদের সংস্থায় যারা চুল-দাড়ি কাটেন তাদের বেশিরভাগই মুসলমান।সূত্র: ওয়ান ইন্ডিয়া বাংলা
এনবিএস/ওডে/সি