গাজায় ভয়াবহ পরিস্থিতি, এক দিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক নিহত

ইসরায়েলের বোমা হামলায় নিহত শিশু সন্তানটাকে বুকে আঁকড়ে রেখেছিলেন আবদুল্লাহ তাবাস। রক্তাক্ত মরদেহটি দাফনের জন্য তার কাছ থেকে নিতে পারছিলেন না কেউই। আহাজারি করতে করতে অসহায় বাবা বলছিলেন, ‘এ আমার মেয়ে, আমি ওকে যতবার খুশি দেখতে চাই।’ এটি ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর ১৯ দিন ধরে চলা টানা নিমর্মতা-নৃশংসতার মাত্র একটি চিত্র।

মঙ্গলবার সারা দিনে ও আগের দিন রাতভর হামলায় উপত্যকাটিতে শত শত মানুষ তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় বোমার আঘাতে ৭০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে ৩০৫টিই শিশু।

৭ অক্টোবর ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত শুরুর পর থেকে এক দিনে এত মৃত্যু দেখেননি গাজার বাসিন্দারা। এর মধ্য দিয়ে উপত্যকাটিতে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮০০। আহত ১৬ হাজার ২৯৭ জন। এরআগে ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র গ্রুপ হামাসের হামলায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি ইসরায়েলি।

ইসরায়েল বলছে, হামাসকে নির্মূল করতেই তাদের এ হামলা জোরদার করেছে তাদের সামরিক বাহিনী। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টোটা। গাজায় হামলা চালানোর ক্ষেত্রে কোনো বাছবিচার করছে না তারা। অবিরাম বোমাবর্ষণে নিমেষে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে আবাসিক ভবন, শরণার্থীশিবির, মসজিদ, গির্জা, হাসপাতালসহ শত শত অবকাঠামো। মঙ্গলবারও ইসরায়েল জানিয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় তারা গাজার ৪০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

ইসরায়েলের প্রতিটি বোমার আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে গাজার হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে আহত, চিরতরে পঙ্গু হওয়া মানুষের ভিড়। চিকিৎসকেরা বলছেন, বোমায় আহত ব্যক্তিদের ক্ষত দেখে মনে হচ্ছে যেন তাদের ত্বক গলে যাচ্ছে। এই ক্ষত চিকিৎসায় কোনো ওষুধ হাসপাতালে নেই। এই অবস্থায় ইসরায়েল কী ধরনের মারণাস্ত্র ব্যবহার করছে, তা খতিয়ে দেখতে আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

ইসরায়েলের নির্বিচার ও টানা হামলায় গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে বলে মঙ্গলবার জানিয়েছেন স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আশরাফ আলকুদরা। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ দিনে ইসরায়েলের হামলায় গাজায় ৬৫ চিকিৎসাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে ২৫টি অ্যাম্বুলেন্স। এ ছাড়া ১২টি হাসপাতাল ও ৩২টি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলেছে, গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে কাজ বন্ধ হয়ে গেছে।

অবরুদ্ধ গাজার খান ইউনিসের ইমাদ আবুয়াসি বলেছেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছি, আগামী  দুইতিন দিনের মধ্যে এক টুকরা খাবারের জন্য মানুষ খুনোখুনি শুরু করবে। আপনি একটু রুটি কিনতে যান, দেখতে পাবেন মানুষ কীভাবে ধাক্কাধাক্কি করছে।’ খাবারের অভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন উপত্যকাটির ২৩ লাখ বাসিন্দা।

শুধু খাবারই নয়, ৯ অক্টোবর ইসরায়েল গাজা অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে সেখানে চলছে বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চরম সংকট। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিএর কর্মকর্তা জুলিয়েট টোউমা বলেছেন, তাদের ১৫০টি আশ্রয়শিবিরে ছয় লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের খাবার, পানি, স্বাস্থ্য-সুরক্ষা সরঞ্জাম ও নিরাপত্তা প্রয়োজন। মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘আমরা যদি জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি না পাই, তাহলে বুধবার (২৫ অক্টোবর) রাত নাগাদ গাজায় আমাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে।’

এদিকে শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত মিসর থেকে রাফাহ ক্রসিং হয়ে মাত্র ৫৪ ট্রাক ত্রাণসামগ্রী গাজায় পৌঁছেছে। সংঘাত শুরুর আগে এক দিনেই গড়ে ৪৫০ ট্রাক ত্রাণ পেতেন গাজাবাসী। বর্তমানে গাজায় প্রবেশ করা ত্রাণ নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে আসছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। সূত্র: ওয়ান ইন্ডিয়া বাংলা

এনবিএস/ওডে/সি

Walton Ads