প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে ওঠা অনেক আরব রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের পরিকল্পনায় তৈরি হয়েছিল। এসব ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল নিজস্ব অধিবাসীদের নয়, বরং উপনিবেশিক শাসকদের স্বার্থ রক্ষা।
১৯১৮ সালে ওসমানি শাসন পতনের পর ব্রিটিশ আধিপত্য মধ্যপ্রাচ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছিলেন, সরাসরি শাসন আর সম্ভব নয়। তাই তারা 'স্থানীয় কর্তৃত্ব' নামের একটি মুখোশ তৈরি করে শাসনের পথ খুঁজে নেয়।
এই ‘আরব মুখোশ’ ছিল ব্রিটিশ ‘পরোক্ষ শাসন’ কৌশলেরই নতুন সংস্করণ। উদ্দেশ্য ছিল শাসনের দায়িত্বে অনুগত স্থানীয় নেতাদের বসিয়ে প্রকৃত স্বাধীনতাকে প্রতিহত করা। হাশেমি পরিবার ও অন্যান্য রাজবংশ ছিল এ ব্যবস্থার অংশ।
১৯১৬ সালের সাইক্স-পিকো গোপন চুক্তি ও ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা ছিল ব্রিটিশদের এই পরিকল্পনার অংশ। এ চুক্তিগুলো সরাসরি আরবদের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী ছিল এবং আরব জনগণের স্বার্থকে অবজ্ঞা করে তৈরি করা হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ প্রথমে এসব প্রতারণার খবর জানত না। কিন্তু যখন তথ্য ফাঁস হয়, তখন ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ও ফরাসিরা তখন আবার নতুন ‘মুখোশ’ তৈরি করে জনগণকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে।
১৯২০-এর দশকে ফয়সাল, আবদুল্লাহ, ফুয়াদদের মতো শাসকরা এই উপনিবেশিক কাঠামোয় নিজেদের মানিয়ে নেন। এরা ছিলেন স্বাধীন নেতার মতো নয়, বরং উপনিবেশিক সেবকের ভূমিকায়।
এরপর আসে নাকবা, ফিলিস্তিনি জনগণের উৎখাত। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ বিপ্লব ঘটিয়ে উপনিবেশিক শাসনের বিরোধিতা করে। কিন্তু ১৯৬৭ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশদের স্থলাভিষিক্ত হয়ে নতুন আধিপত্য গড়ে তোলে।
আজকের ‘আরব মুখোশ ২.০’ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় তৈরি। এই শাসকরা মার্কিন নীতির অনুগত থেকেও নিজেদের কৌশলী বলে দাবি করেন। কিন্তু বাস্তবে তারা ফিলিস্তিনের মতো ইস্যুতে জনগণের ইচ্ছার বিপরীতে অবস্থান নেন।
ক্যাম্প ডেভিড, অসলো ও আব্রাহাম চুক্তি ছিল আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া, যা ‘শান্তি’ নামের মোড়কে উপস্থাপন করা হয়েছে। আরব দেশগুলো ছাড় দিতে দিতে এখন অনেকটাই নিঃস্ব, আর ইসরায়েল দখল বাড়িয়েই যাচ্ছে।
গাজা, লেবানন ও ইয়েমেন আজও প্রতিরোধ করে যাচ্ছে। কিন্তু অনেক আরব শাসক এই প্রতিরোধকে স্বীকার করেন না, বরং দমন-পীড়ন ও নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নেন। কেউ কেউ আবার ইসরায়েলি প্রকল্পে বিনিয়োগও করছেন।
‘আরব জাতীয়তাবাদ’ হয়তো মুছে গেছে, কিন্তু ‘আরব মুখোশ’ এখনো বেঁচে আছে। এই মুখোশ কখনোই জনগণের মুক্তির প্রতীক নয়। বরং এটি মুক্তিকে দমন করে, জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে থামিয়ে দেয়।
গাজায় চলমান গণহত্যা এবং ইসরায়েলি আগ্রাসন দেখে বিশ্বজুড়ে জনমনে ক্ষোভ জমছে। তাই প্রশ্ন উঠছে—আর কতদিন টিকে থাকবে এই মুখোশ? ইতিহাস বলছে, যেমন করে এক সময় উপনিবেশ ভেঙেছে, একদিন এই মুখোশও খুলে পড়বে।