আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক অঙ্গনে হঠাৎই এক নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বড় ঘোষণা দিয়েছেন, যা বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা আমেরিকা ও চিনের মধ্যেকার বাণিজ্য যুদ্ধের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, আপাতত আরও ৯০ দিনের জন্য চিনা পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর সিদ্ধান্ত আমেরিকা স্থগিত রাখছে।

এই ঘোষণার পরপরই চিনও দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা বলেছে, আমেরিকা যেহেতু অতিরিক্ত শুল্ক চাপাচ্ছে না, তাই তারাও মার্কিন পণ্যের উপর নতুন করে কোনো শুল্ক আরোপ করবে না। এর ফলে দুই দেশের মধ্যেকার বাণিজ্য সম্পর্কের উত্তেজনা কিছুটা হলেও কমেছে। এই ঘটনা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক স্বস্তির খবর বয়ে এনেছে। অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন, এই বাণিজ্য যুদ্ধ আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।

এর আগে গুঞ্জন চলছিল যে ভারত ও রাশিয়ার পর এবার চিনও আমেরিকার শাস্তির মুখে পড়তে চলেছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে তেল কেনার অভিযোগে চিনের উপর চাপ বাড়ছিল। খোদ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঘোষণায় সেই সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটেছে। ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কতটা দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ৯০ দিনের জন্য চিনা পণ্যের উপর আমেরিকা নতুন করে ১৪৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপাবে না। একইভাবে, চিনও মার্কিন পণ্যের উপর ১২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো থেকে বিরত থাকবে। এর ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আপাতত স্বাভাবিক থাকছে। এই ঘোষণাটি এসেছিল সোমবার, যখন ট্রাম্পকে চিন প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, "আমরা বিষয়টি দেখছি। ওরা খুব ভালোভাবে বিষয় সামলাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কও খুবই ভালো।"

ট্রাম্প এই ঘোষণার জন্য তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল' ব্যবহার করেছেন। এই মাধ্যমটি তিনি প্রায়শই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করেন। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব কৌশল আবারও প্রমাণ করেছেন। গত মে মাসে জেনেভায় আমেরিকা ও চিনের মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছিল। সেই বৈঠকে দুই পক্ষই সম্মত হয়েছিল ৯০ দিনের জন্য বাণিজ্য শুল্কের ব্যাপারে একটি বিরতি দেওয়া হবে।

এরপর জুলাইয়ের শেষে স্টকহোমে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আরও একটি বৈঠক হয়। তবে সেই বৈঠকে নতুন কোনো ঘোষণা আসেনি। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহল কিছুটা হতাশ হয়েছিল। অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন যে এই বিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ নতুন করে শুরু হতে পারে। কিন্তু ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণা সেইসব আশঙ্কাকে আপাতত প্রশমিত করেছে।

ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১০ নভেম্বর রাত ১২টা বেজে ১ মিনিট পর্যন্ত এই নতুন শুল্ক লাগু করার সিদ্ধান্ত স্থগিত থাকবে। এর অর্থ, এই সময়কালে যে শুল্ক বর্তমানে বলবৎ রয়েছে, সেটাই কার্যকর থাকবে। বর্তমানে চিনা পণ্যের উপর আমেরিকা ৩০ শতাংশ শুল্ক নেয় এবং মার্কিন পণ্যের উপর চিন ১০ শতাংশ শুল্ক নেয়। আপাতত এই হারই বজায় থাকবে। এর ফলে উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা এবং আন্তর্জাতিক বাজার কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।

এই সিদ্ধান্তটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে, যা দুই দেশের মধ্যেকার সম্পর্কের জটিলতা সাময়িকভাবে হ্রাস করবে। তবে ভবিষ্যতে কী হবে, তা বলা কঠিন। দুই দেশের মধ্যেকার বাণিজ্য সম্পর্ক সবসময়ই অনিশ্চয়তায় ভরা। এই ৯০ দিনের বিরতি হয়তো দুই পক্ষকে আরও আলোচনার সুযোগ করে দেবে। এর ফলে দুই দেশের নেতারা একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারেন।

এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক বাজার এবং বিভিন্ন দেশ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ, আমেরিকা এবং চিনের বাণিজ্য সম্পর্ক বিশ্ব অর্থনীতির উপর গভীর প্রভাব ফেলে। এই দুই দেশের মধ্যেকার স্থিতিশীলতা বা অস্থিরতা অন্য দেশগুলোর অর্থনীতিতেও সরাসরি প্রভাব ফেলে। ট্রাম্পের এই ঘোষণা একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হলেও, এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এখনও অনিশ্চিত।

সুতরাং, এই ৯০ দিনের বিরতিকে একটি সাময়িক শান্তি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এরপরে কী হবে, তা দেখার জন্য সবাইকে আরও অপেক্ষা করতে হবে। তবে আপাতত, বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের ধাক্কা লাগার ঝুঁকি সাময়িকভাবে এড়ানো গেছে। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বাণিজ্য কত দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

Walton Ads