দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনীর সংখ্যা দ্রুত কমছে, আর ঠিক উল্টো চিত্র উত্তর কোরিয়ায়—যেখানে সৈন্য সংখ্যা বেড়ে প্রায় তিনগুণ বেশি হয়ে গেছে। একদিকে জন্মহার কমে যাওয়ায় দক্ষিণের তরুণদের সেনাবাহিনীতে যোগদানের আগ্রহ কমছে, অন্যদিকে কিম জং উন ক্রমাগত নতুন সৈন্য ও নারী সদস্য যুক্ত করছেন সেনাদলে। ফলে কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক ভারসাম্য নিয়ে বড় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গত ছয় বছরে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাসদস্য সংখ্যা প্রায় ২০% কমে গেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এর মূল কারণ জন্মহার কমে যাওয়া এবং তরুণদের মধ্যে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার অনীহা। একদিকে বয়সী জনসংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কোরিয়ান সমাজে সেনাবাহিনীর কঠোর পরিবেশ নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার আইনপ্রণেতা চু মি-এ সতর্ক করে বলেছেন—“সেনার সংখ্যা কমতে থাকলে, যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও দক্ষতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।”
অন্যদিকে, সীমান্তের ওপারে পরিস্থিতি ভিন্ন। উত্তর কোরিয়া ইতোমধ্যেই ১.৩ মিলিয়ন সেনা নিয়ে বিশ্বের অন্যতম সামরিকায়িত দেশ। গড়ে একজন উত্তর কোরিয়ান সেনা ১০ বছর পর্যন্ত চাকরি করেন, যা তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে দেয়। এর বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়ান সেনারা সাধারণত মাত্র দেড় বছর কাজ করেন।
শুধু তাই নয়, জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রজনন হারেও উত্তর কোরিয়া অনেক এগিয়ে। দক্ষিণ কোরিয়ায় যেখানে জন্মহার বিশ্বের সর্বনিম্ন (০.৭৫), সেখানে উত্তর কোরিয়ার জন্মহার দ্বিগুণেরও বেশি (১.৭৭)। ফলে নতুন প্রজন্মের সেনা জোগান পাওয়ার সম্ভাবনা সিউলের তুলনায় অনেক বেশি।
তবে সবকিছু উত্তর কোরিয়ার পক্ষে নয়। দেশটির প্রযুক্তি দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দক্ষিণ কোরিয়ার উচিত এই সংকটকে সুযোগে পরিণত করে “ছোট কিন্তু শক্তিশালী সেনাবাহিনী” গড়ে তোলা।
সাংমিয়ং বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ চোই বাইং-উক বলেন—“আমাদের হয়তো কম সৈন্য আছে, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা আরও শক্তিশালী হতে পারব।”
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ড্রোন, সাইবার যুদ্ধ ও AI-চালিত প্রযুক্তির মতো আধুনিক উপায়ে দক্ষিণ কোরিয়া সেনা ঘাটতি পূরণ করতে পারবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—“যত প্রযুক্তিই আসুক, দিনের শেষে একজন দক্ষ সৈনিককেই মাঠে লড়তে হবে।”
ইতিমধ্যেই উত্তর কোরিয়া সেনাদলে নারী সদস্যের সংখ্যা বাড়িয়েছে, যা এখন প্রায় ২০% পর্যন্ত পৌঁছেছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় নারী সেনার সংখ্যা মাত্র ৩.৬%, এবং বাধ্যতামূলকভাবে নারীদের সেনায় নেওয়া হয় না। এই বিষয়টি দেশটিতে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেনাবাহিনীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো। অতীতে হয়রানি, হেজিং ও মানসিক চাপের ঘটনা জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এজন্য সরকার কিছু নিয়ম শিথিল করেছে, যেমন সৈন্যদের নির্দিষ্ট সময়ে মোবাইল ব্যবহার করার অনুমতি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটাই যথেষ্ট নয়।
চোই বাইং-উকের মতে, “২০৪০ সালের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী ৩,৫০,০০০ সদস্যও ধরে রাখতে পারবে না, যদি এখনই নতুন পরিকল্পনা না নেওয়া হয়।”
👉 অর্থাৎ, দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। কম জন্মহার ও সেনা সংকটের কারণে তারা কি উত্তর কোরিয়ার সামরিক চাপ সামলাতে পারবে, নাকি প্রযুক্তিই হয়ে উঠবে সিউলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র—তা সময়ই বলে দেবে।