বলিউড পরিচালক বিবেক অগ্নিহেত্রী, যিনি ২০২১ ও ২০২৩ সালে ‘তাসখেন্দ ফাইলস’ ও ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ নির্মাণ করে বিশেষ চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন, এবার নিয়ে এসেছেন এক নতুন বিতর্ক। ১৯৪৬ সালের নোয়াখালী ও কলকাতা দাঙ্গার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর তৃতীয় ছবি ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ মুক্তি পেতে চলেছে ৫ সেপ্টেম্বর।
বিবেক প্রায় এক মাস ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় নোয়াখালীর দাঙ্গার বিভিন্ন তথ্য ও পত্রিকার কাটিং শেয়ার করছেন। কিছু পোস্টে তিনি লিখেছেন, “লক্ষ্মীপূজার রাতে হিন্দু গণহত্যা সংঘটিত হয় গুলাম সারোয়ার ও তার ভাই ছোট মিয়ার ষড়যন্ত্রে।” আরেক পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, “সুচেতা কৃপালনিকে ধর্ষণ করলেই মিলবে ‘গাজী’ খেতাব।”
সুচেতা কৃপালনী ছিলেন মোহনদাস গান্ধীর অনুগামী তরুণ কংগ্রেস নেত্রী, যিনি নোয়াখালীতে দাঙ্গা রোধে কাজ করছিলেন। অন্যদিকে গুলাম সারোয়ার হুসেইনি ছিলেন নোয়াখালীর প্রভাবশালী মুসলিম নেতা ও শ্যামপুর দায়রা শরীফের পীর।
বিবেকের সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টগুলোতে আরও বলা হয়েছে, “নোয়াখালীতে কংগ্রেস নেতার বাড়িতে হামলা করে তার ছেলেকে হত্যা, অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হলো।” এত পুরনো ঘটনা নিয়ে হঠাৎ এত আগ্রহ কেন? কারণ, ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ ছবির প্রচার এবং প্রোমোশনের জন্যই তিনি এই সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন চালাচ্ছেন।
ছবির প্রিমিয়ার ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারতে ছবির ট্রেলার লঞ্চ করা হয়েছে ১৬ অগাস্ট, ঠিক সেই দিনে যখন ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার কলকাতায় মুসলিম লীগ ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশনে’-এর ডাক দিয়েছিল।
ছবির কাহিনী:
‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ দেশভাগের ঠিক আগে কলকাতায় দাঙ্গায় হিন্দু ও মুসলিম নিহতের ভয়াবহ কাহিনি এবং নোয়াখালীর দাঙ্গার প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জী সরকার ছবিটিকে রাজ্যের সিনেমা হলে দেখানো যাবে না ঘোষণা করেছে। বিপরীতে, কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিজেপি ছবিটিকে সমর্থন জানাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের যুক্তি, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে ভোটের আগে রাজনীতির পরিবেশ বিষিয়ে দিতে চাইছে পরিচালক। ছবির ট্রেলারে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগও উঠেছে।
অভিনয় ও ট্রেলারের বিতর্ক:
ছবিতে অভিনয় করেছেন মিঠুন চ্যাটার্জি, অনুপম খের, পল্লবী জোশী, শাশ্বত চ্যাটার্জি, প্রিয়াংশু চ্যাটার্জি, দর্শন কুমার প্রমুখ। ‘গোপাল পাঁঠা’ চরিত্রে আছেন সৌরভ দাস। দাঙ্গার সময় তিনি হাজার হাজার হিন্দুর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন বলে বলা হয়। দাঙ্গার সময় গোপাল পাঁঠা ও তার পরিবারের উত্তরাধিকারীরা অভিযোগ করেছেন যে ছবিতে তাকে ‘মুসলিম-বিদ্বেষী কসাই’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা সত্য নয়।
অভিনেতারা বলছেন, তাদের কাজ শুধুই চরিত্রে অভিনয় করা। শাশ্বত চ্যাটার্জি বলেছেন, “আমি ইতিহাসবিদ নই, তাই গল্পে ইতিহাস বিকৃত হয়েছে কি না তা দেখার দায়িত্ব আমার নয়। যারা অভিযোগ করতে চান, তারা আদালতে যেতে পারেন।”
ছবিটি সেন্সর বোর্ডের অনুমোদন পেয়েছে, এবং পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া দেশের অন্যান্য রাজ্যে মুক্তি পাবে।
রাজনীতি ও ইতিহাস বিতর্ক:
বিবেক অগ্নিহেত্রী স্বীকার করেছেন, “আমি হিন্দুদের ইতিহাস নিয়ে ছবি বানাই। অন্য ধর্মের ইতিহাস নিয়ে আমার ক্ষমতা বা দক্ষতা নেই।” অনেক বামপন্থী ইতিহাসবিদও সন্দিহান হলেও দৃঢ়ভাবে দাবি করছেন, দর্শক নিজেদের মতামত জানাতে পারবেন।
‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ মুক্তি পাওয়ার আগে থেকেই ইতিহাস, রাজনীতি এবং বাকস্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়েছে। এই সিনেমা ভারতীয় সিনেমা ও রাজনীতির অম্লমধুর বিতর্কের এক নতুন অধ্যায় খুলেছে।