গত মাসের ঘটনা মনে করলে কল্পনাও করা যেত না—আল-আকসা মসজিদের ভেতরে ইহুদিরা দলবদ্ধভাবে উচ্চস্বরে প্রার্থনা করছে, গান গাইছে, নাচছে এবং ইসরায়েলি পতাকা উড়াচ্ছে। এমনকি কিছু পুরুষ মাটিতে সেজদা দিচ্ছে। মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদে এমন দৃশ্য আগে ছিল অসম্ভব। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা বলছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর পরিস্থিতি একেবারে বদলে গেছে।
ইসলামিক ওয়াকফ-এর আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক আউনি বাজবাজ জানান, “যেসব ইহুদি সেখানে উপস্থিত ছিল, তাদের সংখ্যা অনেক ছিল এবং তাদের মধ্যে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন।” আউনি বাজবাজের মতে, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আল-আকসা মসজিদের ওপর ইহুদিদের সার্বভৌমত্ব জোর করে চাপানো হচ্ছে। পাশাপাশি মুসলিমদের সঙ্গে ইহুদিদেরও সেখানে প্রার্থনার অধিকার দেওয়া হচ্ছে, যা স্পষ্টত আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

জেরুজালেমের পুরনো শহরে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ বহু দশক ধরে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি দখলের কেন্দ্রবিন্দু। ফিলিস্তিনি ও মুসলিমদের কাছে এটি স্বাধীনতা, আত্মপরিচয় ও সংগ্রামের প্রতীক। অন্যদিকে, ইসরায়েলিদের বিশ্বাস এখানে তাদের তৃতীয় মন্দির বা থার্ড টেম্পল নির্মাণ হবে।

দীর্ঘ সময় ধরে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, আল-আকসায় শুধুমাত্র মুসলিমরাই নামাজ পড়তে পারতেন। কিন্তু ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকে ইসরায়েল ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনি ও মুসলিমদের প্রবেশে বিধিনিষেধ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে ইহুদিদের প্রবেশাধিকারে বৃদ্ধি ঘটেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলের অবৈধ বসতিগুলোতে হামলা চালানোর পর এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে গেছে।

বর্তমানে, যখন বিশ্ব গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার দিকে নজর রাখছে, তখন আল-আকসা মসজিদ এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ফিলিস্তিনি আশঙ্কা করছেন, মসজিদটি তার আসল পরিচয় হারাচ্ছে এবং যা দীর্ঘকাল ধরে ভয় পেয়েছিল তারা—অর্থাৎ এটি তৃতীয় ইহুদি মন্দিরে রূপান্তরিত হতে পারে।

উনিশ শতকের শেষদিকে অটোমান সাম্রাজ্য জেরুজালেমের ধর্মীয় স্থানগুলো পরিচালনার জন্য ‘স্ট্যাটাস কো’ নামে একটি চুক্তি করে। এই চুক্তি অনুযায়ী, ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গমিটার আয়তনের আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্স—যার মধ্যে রয়েছে ডোম অফ দ্য রক, কিবলা মসজিদ ও অন্যান্য ভবন—সম্পূর্ণভাবে মুসলিম প্রশাসনের অধীনে থাকে।

এই প্রশাসনকে ইসলামিক ওয়াকফ বলা হয়, যা জর্ডানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। নিয়ম অনুযায়ী, মসজিদের ভেতরে শুধু মুসলিমরা নামাজ পড়তে পারবে। অমুসলিমরা যেতে পারবে, তবে কখন ও কীভাবে, তা ওয়াকফ নির্ধারণ করবে। রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং খনন কাজের দায়িত্বও সম্পূর্ণ ওয়াকফের হাতে।
১৯৯৪ সালে জর্ডানের সঙ্গে ইসরায়েলের শান্তি চুক্তিতে আল-আকসায় ইসলামিক ওয়াকফের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়। ২০০০ সাল পর্যন্ত চুক্তি লঙ্ঘনের ঘটনা খুব কম ঘটেছে, কারণ ইসরায়েল জানত, আল-আকসায় যেকোনো হামলার ফলে বিশ্ব মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া তীব্র হবে।

তবে ২০০২ সালে ইসরায়েলি নেতা এরিয়েল শ্যারন শতশত সশস্ত্র প্রহরী নিয়ে মসজিদে হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পাল্টে যায়। ফিলিস্তিনিরা বিদ্রোহ শুরু করে, যা দ্বিতীয় ইন্তিফাদা নামে পরিচিত। এরপর থেকে ইসরায়েলি দখলদাররা আরও বেশি করে আল-আকসায় প্রবেশ করতে থাকে এবং ধীরে ধীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে।
 

Walton Ads