ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের জল-সংঘাত ফের নতুন মোড় নিয়েছে। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন এক গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে—ভারতের পশ্চিম দিকের নদী সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের জল পাকিস্তানের দিকে প্রবাহিত রাখতে হবে। এই রায়ের পরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সিন্ধু জলচুক্তি ছিল দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার প্রতীক। কিন্তু ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলার পর পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারত চুক্তি স্থগিত ঘোষণা করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তখন স্পষ্টই বলেন, “রক্ত ও জল একসঙ্গে বইতে পারে না।” যদিও এখনো পর্যন্ত পাকিস্তানে জল আটকানোর মতো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ভারত। ইসলামাবাদ সতর্ক করে দিয়েছে—জল বন্ধ হলে এটিকে যুদ্ধের উস্কানি হিসেবে ধরা হবে।
ভারতের আপত্তি আদালতের রায়ে
পাকিস্তানের অভিযোগের ভিত্তিতে হেগের আদালত রায় দিলেও, ভারত একে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক বলছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, “ভারত কখনো এই আদালতের বৈধতা স্বীকার করেনি। তাই এই রায়ের প্রভাব ভারতের সার্বভৌমত্ব বা জল ব্যবহারের অধিকারে পড়বে না।”
বিশেষজ্ঞদের মতে সমাধান এখনো দূরে
কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে সবধরনের যোগাযোগ বন্ধ থাকায় সমাধান এত সহজ নয়। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ উত্তম কুমার সিনহার মতে, জল নিয়ে এই সংকট দ্রুতই এশিয়ার অন্যতম রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে। পাকিস্তান এই রায়কে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যবহার করবে, অন্যদিকে ভারত তার সার্বভৌমত্বের দাবিতে দৃঢ় থাকবে এবং পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলিতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করার চেষ্টা করবে।
ভারতের চাপ বাড়ানোর সম্ভাবনা
পাকিস্তানে ভারতের সাবেক হাই কমিশনার অজয় বিসারিয়া মনে করেন, আগামী কয়েক বছরে ভারত আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বাঁধ নির্মাণ, খাল কাটা বা জলাধার তৈরি করে পাকিস্তানের উপর কৌশলগত চাপ বাড়ানো হতে পারে। তিনি মনে করেন, পাকিস্তান সন্ত্রাস দমন করতে না পারলে জল প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ভারতের পক্ষে সুবিধাজনক হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানের জলনির্ভরতা
পানীয় জল ও কৃষিকাজের জন্য পাকিস্তানের বড় অংশ সরাসরি নির্ভর করে সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব নদীর উপর। তাই এই জল আটকানো হলে দেশটির অর্থনীতি ও কৃষি ভয়াবহ চাপে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামরিক সংঘাতের বদলে কূটনীতি ও সহযোগিতাই একমাত্র সমাধান হতে পারে।
সামনে কোন পথ?
উত্তম কুমার সিনহার মতে, সামনে তিনটি পথ খোলা—তথ্য ভাগাভাগি, প্রকল্পভিত্তিক অডিট এবং নেপথ্য কূটনীতির মাধ্যমে মৌসুমি জলবণ্টন নিয়ে সমঝোতা। তিনি সতর্ক করেছেন, এসব উদ্যোগ না হলে শুধু সংঘাত নয়, সাধারণ মানুষের জীবনই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।