চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত হলো এক নজিরবিহীন সামরিক কুচকাওয়াজ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি স্মরণে আয়োজিত এই মহড়ায় সভাপতিত্ব করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সেনাদের উদ্দেশে তিনি ঘোষণা দেন, চীনের উত্থান এখন “অপ্রতিরোধ্য”।
বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই কুচকাওয়াজ। কারণ, শি জিনপিংয়ের পাশে ছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। প্রথমবারের মতো এই তিন শক্তিশালী নেতা একসঙ্গে বিশ্ব মঞ্চে হাজির হন, যা স্পষ্টতই মার্কিন নেতৃত্বাধীন শৃঙ্খলার প্রতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সেই সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজিজকিয়ান এবং মিয়ানমারের সামরিক জান্তার প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং।
১০ হাজারেরও বেশি সেনা এবং শত শত আধুনিক অস্ত্রের প্রদর্শনী এই কুচকাওয়াজে তুলে ধরে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি ও আধুনিকীকরণ প্রচেষ্টা। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু শক্তির প্রদর্শনী নয়, বরং পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি রাজনৈতিক বার্তাও।
মিয়ানমারের বিতর্কিত অতিথি
মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের জন্য এই সফর এক ধরনের কূটনৈতিক স্বস্তি। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক সরকার ভেঙে দিয়ে দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেন তিনি। তারপর থেকে বিদেশ ভ্রমণ তার জন্য ছিল খুবই সীমিত।
বর্তমানে মিয়ানমারে জান্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ চলছে, অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, তরুণরা দলে দলে দেশ ছেড়ে যাচ্ছে। গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পদক্ষেপ নেয়।
চীনের জন্য মিয়ানমার কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি চীনের অন্যতম সরবরাহকারী বিরল মৃত্তিকা, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং জেড (সবুজ রত্নপাথর), যার সাংস্কৃতিক মূল্য কয়েক হাজার বছরের এবং যার বাজার মূল্য বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে মিয়ানমারের সেনাদের জন্য চীনা যুদ্ধবিমান, কামান ও ড্রোন বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রযুক্তিগত সুবিধা এনে দিয়েছে। তবে সম্পর্ক সবসময় সহজ নয়। বেইজিং জান্তার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রেখেছে, যারা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জান্তাকে একাধিকবার যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত করেছে।
ইতিহাসের অদ্ভুত বাঁক
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর মূল উৎস বার্মা ইন্ডিপেনডেন্স আর্মি (বিআইএ), যা ১৯৪০-এর দশকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গড়ে ওঠে। তাদের প্রধান সহযোগী ছিল সাম্রাজ্যবাদী জাপান। কিন্তু ১৯৪৫ সালে জাপানের আত্মসমর্পণের পর তারা মিত্রশক্তির সঙ্গে যোগ দেয়।
আজ, সেই জাপানের আত্মসমর্পণের স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই বেইজিংয়ে কুচকাওয়াজে সামরিক শক্তি প্রদর্শন করছে চীন। অন্যদিকে, মিয়ানমারের সেনারা এখনো প্রতিবছর রাজধানী নেপিডোতে নিজেদের সামরিক শৌর্যের প্রদর্শনী করে এই ইতিহাস স্মরণ করে।