ইন্দোনেশিয়ায় চলমান জীবনযাত্রার খরচ সংকট ও সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে ক্ষোভ এখন দাউ দাউ করে জ্বলছে। আগস্টের শেষ দিকে প্রকাশিত এক খবর পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে—সংসদ সদস্যরা বেতনের পাশাপাশি মাসে প্রায় ৩ হাজার ডলার আবাসন ভাতা পাচ্ছেন, যা ন্যূনতম মজুরির ১০–২০ গুণ বেশি।

এর পর থেকেই দেশজুড়ে জাভা, সুমাত্রা, সুলাওয়েসি আর কালিমান্তানসহ বিভিন্ন দ্বীপে বিক্ষোভ শুরু হয়। এই বছর এটি প্রথম নয়; ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসেও শিক্ষার্থীরা বাজেট কাটছাঁট আর সামরিক বাহিনীর ভূমিকা বাড়ানোর নতুন আইনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল।

পুলিশের গাড়িতে ডেলিভারি চালকের মৃত্যু

বিক্ষোভ আরও জোরালো হয় রাজধানী জাকার্তায়। সেখানে পুলিশের গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন ২১ বছর বয়সী খাবার সরবরাহকারী আফান কুর্নিয়াওয়ান। তিনি কোনো বিক্ষোভে ছিলেন না; খাবার ডেলিভারি করার সময় দুর্ঘটনার শিকার হন। এ ঘটনায় কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, একজনকে বরখাস্তও করা হয়েছে।

খাদ্য সরবরাহকারী চালকরা এখন ইন্দোনেশিয়ার কম মজুরির “গিগ ইকোনমি” আর ভালো চাকরির অভাবের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। উত্তর সুমাত্রার চালক ইমরান আল জাজিরাকে বলেন, বৈষম্যই ছিল এই আন্দোলনের মূল কারণ—অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত, স্বাস্থ্যসেবা ও জনসেবার বৈষম্য।

ভাতা বাতিল, বিক্ষোভ তবু থামেনি

জনগণের চাপের মুখে সংসদ সদস্যদের আবাসন ভাতা বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের বেতন বৃদ্ধি ও “অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ” বন্ধে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

তবে সংকট শেষ হয়নি। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো ক্ষমতায় এসেই ৮% প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন বাজেট ঘাটতিতে পড়েছেন। বিনামূল্যে স্কুলের খাবার কর্মসূচির জন্য বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে, ঘাটতি মেটাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর অবকাঠামো খাতে কাটা পড়েছে ১৮ বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে মানুষের হতাশা আরও বেড়েছে।

সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ আর পুলিশের কড়া অবস্থান

কুর্নিয়াওয়ানের মৃত্যুর পর বিক্ষোভকারীরা সংসদ সদস্য ও অর্থমন্ত্রীর বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। সুলাওয়েসিতে একটি সরকারি ভবনে আগুন লাগানো হয়, তিনজন নিহত হন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস আর জলকামান ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমন করছে। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন “রাষ্ট্রদ্রোহ ও সন্ত্রাসবাদ” মোকাবিলার মতো কঠোর হতে।

জনতার ক্ষোভ: “আমরা ভুলে যাওয়া মানুষ”

পূর্ব কালিমান্টানের গৃহবধূ রহমাওয়াতি বলেন, “প্রতি বছর দাম বাড়ে, কিন্তু কমে না। আমাদের মনে হয়, নির্বাচনের সময় ছাড়া কেউ আমাদের কথা ভাবে না।”

নারী অধিকারকর্মী আফিফাহ বলেন, বিক্ষোভকারীদের দমন করা আসলে তাদের প্রতিবাদের অধিকার কেটে দেওয়া। “ইন্দোনেশিয়ার জন্য এখন সর্বাত্মক সংস্কার দরকার—অর্থনীতি, পরিবেশ আর গণতন্ত্র সবক্ষেত্রেই।”

সেনাবাহিনীর বাড়তি ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ

বছরের শুরুতে সামরিক বাহিনীর নতুন ক্ষমতা নিয়ে আইন পাস হওয়ায় অসন্তোষ ছিলই। প্রাবোও কয়েক ডজন নতুন ব্যাটালিয়ন গঠন করেছেন, আরও শতাধিকের পরিকল্পনা রয়েছে। আচেহর মতো অঞ্চলে যেখানে সেনাদের দমন-পীড়নের দীর্ঘ ইতিহাস আছে, সেখানে নতুন ব্যাটালিয়ন গড়ার উদ্যোগেও ক্ষোভ বাড়ছে।

সমাজকর্মী মুহাম্মদ বলেন, “আমাদের ৩৫ বছরের সংঘাতের স্মৃতি এখনও তাজা। নতুন ব্যাটালিয়ন মানে আবার ভয় আর অনিশ্চয়তা।”

উপসংহার

মুদ্রাস্ফীতি, বৈষম্য, বেকারত্ব আর রাজনৈতিক হতাশা—সব মিলিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় জনতার ক্ষোভ এখন আগুনে পরিণত হয়েছে। সরকার ভাতা বাতিল করে চাপ সামলানোর চেষ্টা করলেও অর্থনীতি ও নীতির বড় সংস্কার ছাড়া এ সংকট থামার কোনো লক্ষণ নেই।

 

Walton Ads