উপসাগরীয় আরব দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ঝলমলে রাজধানী, দ্রুত বাড়ছে অর্থনীতি আর প্রবাসী শ্রমিকের ঘামে গড়া সমৃদ্ধি—সব মিলিয়ে মনে হত তারা নিরাপদ। কিন্তু চলতি বছর সেই নিরাপত্তার বোধ ভেঙে পড়েছে।
গত জুনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার অজুহাতে ইরান কাতারে আঘাত হানার পর, চলতি সপ্তাহে ইসরায়েল দোহায় হামলা চালিয়েছে। দাবি করা হয়েছে, হামলার লক্ষ্য ছিল হামাস নেতারা।
গাজায় দুই বছর ধরে চলা সংঘর্ষ এখন উপসাগরের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে। সামরিক প্রতিশোধ সীমিত থাকার কারণে কাতার জানিয়েছে, আঞ্চলিকভাবে সম্মিলিত জবাব দেওয়া হবে। এই পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আরব-ইসলামিক সম্মেলনে সপ্তাহান্তে সম্ভবত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।
কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েলি হামলার পর সবচেয়ে দ্রুত সাড়া দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান হামলার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোহায় পৌঁছান এবং বাহরাইন ও ওমানে সফর করেন। শুক্রবার ইসরায়েলি কূটনীতিককে তলব করে হামলাকে ‘নিষ্ঠুর ও কাপুরুষোচিত’ আখ্যা দিয়েছে আমিরাত।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কূটনৈতিকভাবে আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করতে পারে বা আব্রাহাম অ্যাকর্ডস থেকে আংশিক সরে আসতে পারে। কাতারও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের পথ অবলম্বন করা হবে। ইতিমধ্যেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানিয়ে সর্বসম্মত বিবৃতি আনার ক্ষেত্রে দোহা সফল হয়েছে।
নিরাপত্তা চুক্তি
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকলেও তা এখনো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। সৌদি-ভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের বলেছেন, ‘পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্স’ সক্রিয় করার সময় এসেছে। এতে যৌথ কমান্ড, সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং স্বাধীন সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে এই নিরাপত্তা কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর। ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় দেশগুলো আরও শক্ত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন হবে।
অর্থনৈতিক চাপ
কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত ও আমিরাতের বিশাল সার্বভৌম সম্পদ তহবিল বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে বয়কট করা বা বিনিয়োগ সীমিত করা হতে পারে।
কুয়েতি অধ্যাপক বাদের আল-সাইফ সতর্ক করে বলেন, “এখনই শক্ত অবস্থান না নিলে, অন্য কোনো উপসাগরীয় রাজধানী হতে পারে পরবর্তী টার্গেট।”
উপসাগরের নিরাপত্তা, কূটনীতি ও অর্থনীতির ভারসাম্য এই মুহূর্তে সব দিক থেকে পরীক্ষা নিচ্ছে।