মাদাগাস্কারে রাষ্ট্রপতি আন্দ্রে রাজোয়েলিনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ এখন এক নতুন মোড় নিয়েছে। গত মাসে শুরু হওয়া তরুণদের নেতৃত্বাধীন জেন জি আন্দোলনে এবার যোগ দিয়েছেন দেশটির কিছু সেনা সদস্যও। রাজধানী আন্তানানারিভোর প্রতীকী ‘১৩ মে স্কোয়ারে’ বিক্ষোভকারীরা প্রথমবারের মতো প্রবেশ করেছে, যা আন্দোলনের ইতিহাসে বড় এক মুহূর্ত।
বিক্ষোভ দমনে কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নিলেও বৃহস্পতিবারের সংঘর্ষে একাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়ংকর সব ভিডিও, যেখানে দেখা গেছে—নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের পিটিয়ে অচেতন করে ফেলছে। এএফপি’র সাংবাদিকরাও ঘটনাস্থলে এসব সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছেন।
এ নিয়ে জাতিসংঘ উদ্বেগ প্রকাশ করে শুক্রবার এক বিবৃতিতে কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানায়, “অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ বন্ধ করুন, জনগণের অবাধ মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করুন।”
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভে অন্তত ২২ জন নিহত এবং ১০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। তবে প্রেসিডেন্ট রাজোয়েলিনা এই সংখ্যাকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে দাবি করে জানান, নিহতদের মধ্যে মাত্র ১২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং “তারা সবাই ছিল লুটেরা ও ভাঙচুরকারী”।
সেনাবাহিনীর মধ্যে ভাঙন
রাজোয়েলিনা প্রথমে আপসের ইঙ্গিত দিলেও এখন আরও কড়া অবস্থান নিয়েছেন। বিক্ষোভের জেরে তিনি তার পুরো সরকারকে বরখাস্ত করেন। কিন্তু এরপরই নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সেনা কর্মকর্তা রুফিন ফরচুনাত জাফিসাম্বোকে নিয়োগ দেন এবং মন্ত্রিসভায় পুলিশের ও সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
এদিকে, রাজধানীর উপকণ্ঠে এক ব্যারাকে অভিজাত ইউনিটের সদস্যরা এক সভায় প্রকাশ্যে বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়েছেন। এই ইউনিটই ২০০৯ সালে রাজোয়েলিনাকে ক্ষমতায় বসাতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। এবার তারা বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিচ্ছে।
এক ভাইরাল ভিডিওতে সৈন্যদের বলতে শোনা গেছে—
“আমাদের ভাই-বোনদের গুলি করার জন্য কেউ আমাদের টাকা দিতে পারবে না। যারা সহযোদ্ধাদের হত্যা করতে বলে, তাদের দিকেই অস্ত্র তাক করো!”
তারা আরও আহ্বান জানিয়েছে, বিমানবন্দরে অবস্থানরত সেনাদের যেন সব উড্ডয়ন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অন্যান্য ব্যারাকের সৈন্যরা যেন “বন্ধুদের ওপর গুলি চালানোর আদেশ প্রত্যাখ্যান” করে।
স্বাধীনতার পর থেকে অস্থিরতা
১৯৬০ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে মাদাগাস্কার বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়েছে। ২০০৯ সালের গণবিক্ষোভেই রাজোয়েলিনা প্রথম ক্ষমতায় আসেন, যখন সেনাবাহিনী তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মার্ক রাভালোমানানাকে অপসারণ করেছিল। পরে তিনি ২০১৮ এবং ২০২৩ সালের নির্বাচনে পুনরায় জয়লাভ করেন—যদিও বিরোধীরা সেই নির্বাচন বর্জন করেছিল।
জেন জি-র প্রভাব
সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভ শুরু হয় ২৫ সেপ্টেম্বর, ভারত মহাসাগরীয় এই দ্বীপদেশে, কেনিয়া ও নেপালের জেন জি আন্দোলনের অনুপ্রেরণায়। বিদ্যুৎ ও পানির সংকট থেকে শুরু হওয়া ক্ষোভ এখন পুরোপুরি সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
শনিবার রাজধানীর ১৩ মে স্কোয়ারে সেনাদের উপস্থিতিতে হাজারো তরুণের ঢল নামে। বহু বছর ধরে কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা এই স্কোয়ারে এমন দৃশ্য দেখা যায়নি অনেকদিন।
এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় যুব-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ, যা মাদাগাস্কারের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে নতুন এক মোড়ে নিয়ে যেতে পারে।