কয়েক সপ্তাহ আগেও যা অকল্পনীয় ছিল, এখন তা বাস্তবতা—গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ থামছে, অন্তত আপাতত।
৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইসরায়েল ও হামাস এক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছেছে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই ভয়াবহ সংঘাতের এটিই হতে পারে প্রথম বড় সমাপ্তি।
তবে, এই যুদ্ধবিরতি কতটা স্থায়ী হবে—তা নিয়ে রয়েছে বহু প্রশ্ন। ইসরায়েলের অভিযান থামানো এবং হামাসের হাতে থাকা বন্দীদের মুক্তির প্রতিশ্রুতি থাকলেও, পুরো “রোডম্যাপ” এখনো অস্পষ্ট। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, এটি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য আবারও আলোচনার জটিলতা তৈরির সুযোগ হতে পারে।
🇺🇸 ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা: নতুন ‘শান্তির রোডম্যাপ’ নাকি পুরনো ফাঁদ?
সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আরব নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আসে এক নতুন মোড়। এতে ইসরায়েলের কিছু কঠোর দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়, যা হামাসের সমর্থন পাওয়ার পথ খুলে দেয়।
ফলে নেতানিয়াহু কিছুটা চাপে পড়েছেন, এবং ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে নিজেদের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখাচ্ছে।
তবে অনেকেই বলছেন, এই পরিকল্পনার কিছু অংশ পুরনো যুদ্ধবিরতির মতোই, যা টেকসই নয়।
ট্রাম্প বনাম নেতানিয়াহু: ‘বন্ধুদের’ মধ্যে নীরব লড়াই
ট্রাম্প এবার নিজেকে আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মতো নন, তা প্রমাণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
নেতানিয়াহু বহু বছর ধরে মার্কিন রাজনীতিতে প্রভাবশালী, কিন্তু এবার ট্রাম্প তার প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
প্রেসিডেন্টের লক্ষ্য স্পষ্ট—“রাজনৈতিক জয়” অর্জন।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের দ্রুত চুক্তির আকাঙ্ক্ষা মাঝে মাঝে বিপরীত ফল দেয়। তাঁর ঘোষিত অনেক “শান্তি জয়” পরে ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে।
ইরান, হামাস ও ইসরায়েল: যুদ্ধবিরতির পরেও উত্তেজনা অব্যাহত
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েল গাজায় নতুন হামলা চালিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ দেখাচ্ছে যে বাস্তবে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।
এদিকে, নেতানিয়াহু এখনো তার ডানপন্থী জোটের চাপে রয়েছেন, যারা হামাসের সঙ্গে কোনো চুক্তির বিরোধী।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতা ট্রাম্পের পরিকল্পনার ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
শান্তির পথে বাধা: ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও মার্কিন দ্বিধা
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও তার রাজনৈতিক অবস্থান তাঁকে যুদ্ধবিরতি রক্ষার পথে দুর্বল করছে।
একই সঙ্গে ট্রাম্প যদি তার রক্ষণশীল ভোটার ঘাঁটিকে বিরক্ত না করে জেরুজালেমে চাপ প্রয়োগ না করেন, তাহলে ইসরায়েলি নেতারা এই পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করার পথ খুঁজে নেবে—এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
আব্রাহাম চুক্তির ছায়ায় ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’
ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য স্পষ্ট—সংঘাত নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক একীকরণের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতি আনা।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়: এতে কি ফিলিস্তিনিরা ন্যায্য রাষ্ট্র পাবে? নাকি এটি কেবল ইরানের বিরুদ্ধে নতুন জোট তৈরির কৌশল?
সমালোচকরা বলছেন, পরিকল্পনাটি আশাব্যঞ্জক শোনালেও বাস্তবে এটি “কাগুজে শান্তি” ছাড়া কিছু নয়।
বিশ্লেষণ: শান্তি নাকি স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নতুন নাটক?
ইসরায়েলের উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট—ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
ফলে, যুদ্ধবিরতি হলেও দখল ও বর্ণবাদের কাঠামো অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
অতীতের মতো, ট্রাম্পের পরিকল্পনাও হয়তো ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের মূল সমস্যা সমাধান করতে পারবে না।
বরং, এটি নতুন রূপে পুরনো সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
উপসংহার
গাজায় যুদ্ধবিরতি নিঃসন্দেহে স্বস্তির সংবাদ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—যুদ্ধের চেয়ে কঠিন হবে শান্তি টিকিয়ে রাখা।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক হিসাব, ট্রাম্পের কূটনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, এবং অঞ্চলের তীব্র বিভাজন—সব মিলিয়ে এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে কিনা, তা নিয়েই এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ।