সুইজারল্যান্ডের বার্নিজ ওবারল্যান্ড অঞ্চলের পাহাড়ের কোলঘেঁষা একটি ছোট ও অদ্ভুত গ্রাম মারেন। মধ্যযুগীয় এই গ্রামে পৌঁছানোর কোনো সড়কপথ নেই। গাড়ি তো নয়ই—বহির্বিশ্বের সঙ্গে এর যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হলো বিশ্বের সবচেয়ে ঢালু কেবল কার , যার নাম 'শিলথর্নবান'। এই কেবল কার চালু হওয়ায় পর্যটকরা মাত্র চার মিনিটে ৭৭৫ মিটার ওপরে থাকা এই গ্রামটিতে পৌঁছাতে পারছেন।

বিবিসিতে প্রকাশিত এক ভ্রমণ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন থাকা মারেন গ্রামে আগে যাতায়াত ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। একসময় গ্রামের বাসিন্দাদের প্রতিদিন প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য পাহাড় বেয়ে তিন ঘণ্টা নিচে নামতে হতো!

পরে, ১৮৯১ সালে একটি সরু রেলপথ এবং ১৯৬৫ সালে সিঙ্গেলট্র্যাক কেবলওয়ে চালুর মাধ্যমে সীমিত সংযোগ গড়ে ওঠে। তবে পাহাড়ের অত্যন্ত খাড়া গঠন ও পরিবেশগত কারণে এখানে গাড়ির রাস্তা তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

গত বছরের শেষ দিকে ভ্রমণবিষয়ক সাংবাদিক শিখা শাহ মারেন গ্রাম ভ্রমণ করে তাঁর অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি জানিয়েছেন, লাউটারব্রুনেন থেকে স্টেচেলবার্গ গাড়ি পার্কিং পর্যন্ত পৌঁছে কাচঘেরা কেবিনে ওঠার পর থেকেই শুরু হয় অপূর্ব এক যাত্রা। কেবল কারে বসে বরফঢাকা পাইনগাছ ও ছোট কটেজগুলো তাঁর কাছে যেন গল্পের বইয়ের ছবির মতো মনে হচ্ছিল।

১৩ শতকের পুরোনো মারেনে রয়েছে কাঠ ও পাথরে তৈরি ঐতিহ্যবাহী কটেজ, সরু রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ অতিথিশালা ও রেস্তোরাঁ। এখানে বিখ্যাত চিজ-ড্রাই সসেজ সহ সুইস খাবারের বৈচিত্র্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি ছোট দোকানগুলোতে বিক্রি হয় সুইস চকলেট, ঘড়ি ও পোস্টকার্ডসহ নানা স্মারক।

গ্রামের সবচেয়ে ঐতিহাসিক স্থাপনা হলো 'হোটেল মারেন প্যালেস', যা তৈরি হয়েছিল ১৮৭৪ সালে। 'সুইজারল্যান্ডের প্রথম প্রাসাদ' হিসেবে পরিচিত এই হোটেলে একসময় স্কি-জগতের তারকা এবং হলিউড অভিনেত্রী রিটা হেওয়ার্থসহ বহু আন্তর্জাতিক অতিথি অবস্থান করেছেন। ২০ শতকে এই হোটেলের বলরুম ছিল ধনীদের আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু।

স্কিইংয়ের জন্য বিখ্যাত হলেও মারেন এখন জনপ্রিয় প্যারাগ্লাইডিং গন্তব্যও বটে। স্থানীয় বাসিন্দা বার্নার্ড লানের পরিবার ১৮৯০-এর দশক থেকেই এ গ্রামে পর্যটন বিকাশের সঙ্গে জড়িত। তাঁর প্রপিতামহ হেনরি লান প্রথম ব্রিটিশ পর্যটকদের এখানে নিয়ে আসেন। ১৯৩০ সালে মারেনে চালু হয় দেশের প্রথম স্কি স্কুল। এর এক বছর পর ১৯৩১ সালে এখানে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম আলপাইন বিশ্ব স্কি চ্যাম্পিয়নশিপ।

স্থানীয়রা জানান, গাড়িবিহীন এই গ্রামে কেবল কারই দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। স্কুলে যাওয়া থেকে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া—সবকিছুই কেবল কারের ওপর নির্ভরশীল। তবুও এই বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং ঘনিষ্ঠ সম্প্রদায়ের বন্ধনই মারেন গ্রামকে করে তুলেছে অনন্য।

 

Walton Ads