মাত্র ১০-১৫ দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে ইরানকে চূড়ান্ত চাপে ফেলতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প! কিন্তু আকাশ-সমুদ্র জুড়ে মার্কিন শক্তি দেখানোর পাল্টায় এমন মহড়া ও কূটনৈতিক চমক দিয়েছে তেহরান, যে স্তব্ধ গোটা বিশ্ব!

মধ্যপ্রাচ্যে ফের যুদ্ধের আগুন জ্বলতে চলেছে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ইস্যুতে নতুন চুক্তিতে আসতে ১০ থেকে ১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার পর থেকেই গোটা অঞ্চল যুদ্ধের আগাম আভাস দিচ্ছিল। কিন্তু ইরান যে এই চাপের মুখে শুধু মাথা নত না করে বরং একের পর এক পাল্টা শক্তি প্রদর্শন করে বিশ্বকে চমকে দেবে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল সামরিক সমাবেশ শুরু করেছে। সবচেয়ে শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড আটলান্টিক পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছে গেছে। এটি খুব শিগগিরই ওমান উপকূলে অবস্থানরত ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের সাথে যোগ দেবে । এছাড়া ১২০টির বেশি যুদ্ধবিমান, টমাহক ক্রুজ মিসাইল সজ্জিত গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার নিয়ে মার্কিন বাহিনী যেন ইরানের চারপাশে বলয় তৈরি করেছে ।

কিন্তু মার্কিন এই শক্তি প্রদর্শনের জবাব দিতে মোটেও দেরি করেনি ইরান। ট্রাম্পের আল্টিমেটাম উপেক্ষা করে ইরান শুক্রবার জানিয়ে দিল, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি সম্ভাব্য পরমাণু চুক্তির খসড়া তৈরি করতে যাচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যেই এই খসড়া তৈরি হয়ে যাবে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সাময়িক বন্ধের কোনো প্রস্তাব তারা দেয়নি, আর মার্কিন পক্ষও আনুষ্ঠানিকভাবে 'জিরো এনরিচমেন্ট' দাবি করেনি ।

আরাকচি এক সাক্ষাৎকারে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, "ইরানের পরমাণু কর্মসূচির কোনো সামরিক সমাধান নেই। এই পথ ইতিমধ্যেই পরীক্ষা করা হয়েছে। আমাদের স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে, আমাদের বিজ্ঞানীদের হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু তারা কর্মসূচি নির্মূলে ব্যর্থ হয়েছে।" তিনি আরও বলেন, ইরানের চারপাশে সামরিক শক্তি বাড়ানো সমস্যার সমাধান করবে না, বরং তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে ।

শুধু কূটনৈতিক নয়, সামরিক দিক থেকেও চমকে দিয়েছে ইরান। ট্রাম্পের আল্টিমেটামের মধ্যেই ওমান উপসাগর ও উত্তর ভারত মহাসাগরে রাশিয়ার সাথে যৌথ নৌমহড়া চালিয়েছে তেহরান। এর আগে হরমুজ প্রণালীতে আইআরজিসি-র মহড়ায় ইরান সাময়িকভাবে এই কৌশলগত জলপথ বন্ধ করে দেয়, যা বিশ্লেষকদের মতে সংঘাত শুরু হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটানোর সক্ষমতা দেখানোর কৌশল । এছাড়া ভারতের আয়োজিত মিলান ২০২৬-এ অংশ নিয়ে ৭০টিরও বেশি দেশের নৌবাহিনীর সাথে যৌথ মহড়ায় যোগ দিয়েছে ইরান ।

এদিকে যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন বিপর্যয়ের মুখেও পড়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কায় ইরানবিরোধী কোনো অভিযানে ব্রিটিশ ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া এবং ব্রিটেনের ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে না লন্ডন। এই ঘাঁটিগুলো ছাড়া দূরপাল্লার বি-২ ও বি-৫২ বোমারু বিমান মোতায়েন ও দীর্ঘমেয়াদি অভিযান পরিচালনা করা মার্কিন বাহিনীর জন্য কঠিন হবে বলে সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন ।

ক্ষুব্ধ ট্রাম্প চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসকে ফেরত দেওয়ার ব্রিটিশ সিদ্ধান্তে মার্কিন সমর্থন প্রত্যাহার করেছেন। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, "জাতির সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে লিজ দেওয়া ভালো নয়। ইরান যদি পরমাণু চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে বিপজ্জনক এই শাসকের সম্ভাব্য হামলা নির্মূলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিয়েগো গার্সিয়া ও ফেয়ারফোর্ডের বিমানঘাঁটির প্রয়োজন হতে পারে।" ।

সমর বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন এক কঠিন অবস্থানে। একদিকে তিনি এত বড় সামরিক শক্তি সমাবেশ করেছেন যে কোনো 'সাধারণ' চুক্তি নিয়ে ফিরলে তিনি মুখ হারাবেন। অন্যদিকে ইরানকে সরাসরি আক্রমণ করলে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আয়ার বলেছেন, "ট্রাম্প যা করতে পারেন না তা হলো এই বিশাল সামরিক শক্তি সমাবেশ করে 'সাধারণ' একটা চুক্তি নিয়ে ফিরে আসা এবং সেনা প্রত্যাহার করা। যদি তিনি আক্রমণ করেন, তাহলে তা দ্রুতই ভয়াবহ রূপ নেবে।" ।

ট্রাম্প অবশ্য শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য 'সীমিত সামরিক হামলা' চালানোর কথা ভাবছেন। কিন্তু ইরানের জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে মার্কিন ঘাঁটি ও সম্পদ বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে ।

এখন দেখার পালা, ট্রাম্পের চরমপত্রের জবাবে ইরানের এই বহুমুখী শক্তি প্রদর্শন যুদ্ধ ঠেকাতে পারে, নাকি নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে অগ্নিকাণ্ডের সূচনা করে?

 

Walton Ads