ঢাকা, বুধবার, জুলাই ১৫, ২০২৬ | ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
Logo
logo

কাশ্মীরে সাংবাদিকদের ওপর ক্র্যাকডাউন: সবাই ভাবে ‘এটিই হয়তো শেষ রিপোর্ট’


এনবিএস ওয়েবডেস্ক  | প্রকাশিত:  ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, ০৬:০৯ পিএম

কাশ্মীরে সাংবাদিকদের ওপর ক্র্যাকডাউন: সবাই ভাবে ‘এটিই হয়তো শেষ রিপোর্ট’

 কাশ্মীরে সাংবাদিকদের ওপর ক্র্যাকডাউন: সবাই ভাবে ‘এটিই হয়তো শেষ রিপোর্ট’

ভারত শাসিত কাশ্মীরে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল ছিল সুলতান পরিবারের জন্য একটা আনন্দের দিন। সাড়ে তিন বছর ধরে থানা-পুলিশ-আদালতে ঘোরাঘুরি করার পর সেদিন তারা একটা ভালো খবর পেয়েছেন। খবরটা হলো - সাংবাদিক আসিফ সুলতান  অবশেষে জামিন পেয়েছেন। তিনি কখন শ্রীনগরের কেন্দ্রস্থলে বাটামালুস্থ বাড়িতে ফিরবেন তার অপেক্ষায় ছিলেন আত্মীয় স্বজনরা। কিন্তু তাদের অপেক্ষা যখন কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনে পরিণত হলো তখন তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

এর কারণ - এপ্রিল মাসের ১০ তারিখ আসিফের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল আরেকটি অভিযোগ। তাকে মুক্তি দেয়া হয়নি, বরং তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় কাশ্মীর রাজ্যের বাইরে আরেকটি কারাগারে - যেখানে তাকে দেখতে যাওয়াটাও সমস্যাজনক।

মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ চলছে ১৯৮৯ সাল থেকে। এখানেই জঙ্গী তৎপরতাকে সহায়তার দায়ে আসিফ সুলতান প্রথম অভিযুক্ত হয়েছিলেন । সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএ-র আওতায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয় - যাতে জামিন পাওয়া খুবই কঠিন।

দ্বিতীয় মামলাটিও জননিরাপত্তা আইন বা পিএসএ নামে আরেকটি বিতর্কিত আইনের আওতায়। এটিতে কোন মামলা ছাড়াই কাউকে দুই বছর পর্যন্ত বন্দী রাখা যায়।

ভারত সরকারের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ অনুসন্ধান করতে বিবিসি এক বছরেরও বেশি সময় ব্যয় করেছে। অভিযোগে বলা হয়, এ অঞ্চলে সংবাদ মাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে ও তাদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করতে সরকার পরিকল্পিতভাবে এক অশুভ কার্যক্রম চালাচ্ছে।

কাশ্মীরের সাংবাদিকদের সাথে বিবিসি’র সংবাদদাতাদের দেখা করতে হয়েছে গোপনে। প্রতিশোধের শিকার হবার ভয়ে তারা তাদের পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেছেন।

অনেকবার সেখানে গিয়ে দুই ডজনেরও বেশি সাংবাদিকের সাথে কথা বলেছে বিবিসি’র সাংবাদিকরা। তাদের মধ্যে কেউ রিপোর্টার, কেউ বা সম্পাদক, কেউ ফটোসাংবাদিক। তারা অনেকেই জাতীয় বা আঞ্চলিক মাধ্যমে কর্মরত - কেউ আবার স্বাধীনভাবে কাজ করেন।

 তারা সবাই সরকারের কর্মকাণ্ডকে তাদের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখেন।

বিবিসি বাংলা জানায়, আসিফ সুলতান কারাভোগ করছেন পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে। তার মতই আরো অন্তত সাত জন কাশ্মীরী সাংবাদিক ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত জেলে গেছেন। তাদের মধ্যে চার জন - আসিফ সহ - এখনো বন্দী।

জামিন হলেই নতুন মামলায় আবার গ্রেফতার: একটি ডিজিটাল ম্যাগাজিনের সম্পাদক ফাহাদ শাহকে সন্ত্রাস দমন আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সন্ত্রাসবাদ প্রচার-প্রসারের।  এর এক মাস আগেই গ্রেফতার করা হয় ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক সাজাদ গুলকে। তিনি তার কিছুদিন আগে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন যাতে স্থানীয় লোকদের ভারতবিরোধী শ্লোগান দিতে দেখা যায়। তার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়।

সাংবাদিক আটকের সবশেষ ঘটনাটি ঘটে এ বছর মার্চ মাসে। সন্ত্রাসে অর্থ যোগানের সাথে সম্পর্ক থাকার দায়ে গ্রেফতার করা হয় ইরফান মেরাজকে - যার কাজ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বেরিয়েছে।

এসব ব্যাপারে বিবিসি স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সাথে কথা বলার জন্য অনেক চেষ্টা করলেও জবাব পাওয়া যায়নি।

মে মাসে বিবিসি ওই অঞ্চলের শীর্ষ প্রশাসক মনোজ সিনহাকে মিডিয়ার ওপর ক্র্যাকডাউন বিষয়ে প্রশ্ন করে। তিনি বলেন, প্রেস সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করছে। তার ভাষায় - সাংবাদিকদের আটক বা গ্রেফতার করা হয়েছে সন্ত্রাস বা সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টার দায়ে, তাদের সাংবাদিকতা বা রিপোর্ট লেখার জন্য নয়।

 বিবিসি এমন অনেক বর্ণনা শুনেছে যা মনোজ সিনহার দাবির সাথে মেলে না। ‘এখানে পুলিশের ডাক পাওয়া একজন সাংবাদিকের জন্য খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, এবং এমন অনেক ঘটনা আছে যেখানে রিপোর্টাররা তাদের রিপোর্টের জন্য আটক হয়েছেন’, বলেন একজন সাংবাদিক। ‘আমার করা একটি রিপোর্টের ব্যাপারে আমি পুলিশের কাছ থেকে ফোন পেতে শুরু করি। তারা বার বার জিজ্ঞেস করতো যে, এ রিপোর্ট আমি কেন করেছি? তারা বলতো, তারা আমি ও আমার পরিবারের ব্যাপারে সবই জানে, যা খুবই ভয়ের ব্যাপার। আমার সব সময় মনে হতো - আমি গ্রেফতার বা নির্যাতনের শিকার হবো কিনা।’

যে সাংবাদিকদের সাথে বিবিসির কথা হয়েছে তাদের ৯০ শতাংশই বলেছেন তাদের অন্তত একবার পুলিশ তলব করেছে।

‘আমরা এই ভয়ের মধ্যে থাকি যে যেকোনো রিপোর্টই হয়তো হবে আমার শেষ রিপোর্ট - এর পরই আমাকে জেলে যেতে হবে’ - বলেছেন একজন সাংবাদিক। আরেকজনের কথা - ‘কাশ্মীরে সাংবাদিকতার মৃত্যু হয়েছে, তা কবরে চলে গেছে।’

‘কাশ্মীরে সাংবাদিকদের সাথে অপরাধীর মত আচরণ করা হয়, তাদের দেশ-বিরোধী, সন্ত্রাস সমর্থক, পাকিস্তানপন্থী বলে ডাকা হয়। তারা বোঝে না যে আমাদের কাজ সব পক্ষের মতামত তুলে ধরা’- বলেন একজন।

বিশেষ করে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট  ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল এবং প্রদেশটিকে দুইভাগে ভাগ করার পর পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়েছে।

‘আমরা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় আছি, আমরা সবাই নিজেদেরকে নিজেরাই সেন্সরশিপ করছি,’ বলেন এক সাংবাদিক। ‘আমি আমার রিপোর্ট একবার সাংবাদিক হিসেবে পড়ি, তার পর পুলিশের মত পড়ি এবং নানা তথ্য বাদ দিয়ে একে আরো নরম করতে থাকি। এখানে সাংবাদিকতা বলে তেমন কিছু আর নেই, বেশিরভাগই সরকারের জনসংযোগের মত।’

এখন সম্পাদকেরা বলছেন - তারা কী ছাপবেন আর কী বাদ দেবেন তা নিয়ে প্রশাসন প্রায়ই নির্দেশনা দেয়।

সাংবাদিকদের সাথে বিবিসির কথা হলে তারা বেশির ভাগই বলেন তারা রাষ্ট্রের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের ভয়ে আছেন। কেউ কেউ বলেন তাদের জঙ্গিদের দিক থেকেও হুমকি রয়েছে।

প্রেসক্লাব এখন বন্ধ: সংঘাতবিক্ষুব্ধ কাশ্মীরে একটি জায়গা ছিল যেখানে সাংবাদিকরা অবাধে একসাথে হতে পারেন, সেটি হলো শ্রীনগরের প্রেস ক্লাব। সাংবাদিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষারও জায়গা এটিই। গত বছর সরকার এটি বন্ধ করে দিয়েছে। এটি এখন পুলিশের একটি অফিস।সূত্র: ওয়ান ইন্ডিয়া বাংলা

এনবিএস/ওডে/সি