এনবিএস ওয়েবডেস্ক | প্রকাশিত: ০৮ জানুয়ারী, ২০২৪, ০১:০১ পিএম
ভুটানে নির্বাচন মঙ্গলবার, চীনের সঙ্গে থিম্পুর চুক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত: বিশ্লেষণ
ছোট দেশ ভুটানে সংসদ নির্বাচন ৯ জানুয়ারি মঙ্গলবার। এ নির্বাচন ঘিরে ভুটানের ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে দুই বৃহৎ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চীন। হিমালয়ের অঞ্চলের দেশটি নিয়ে দেশ দুইটি তৎপরতা বেশ চোখে পড়ার মতো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্তে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান ও প্রভাব বাড়াতে ভারত ও চীন উভয়েই ভুটানকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। গত অক্টোবরে ভুটান ও চীনের মধ্যে একটি ‘সহযোগিতা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাদের এ চুক্তি ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে ভুটানকে ‘বাফার স্টেট’ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক হার্শ ভি পন্ত বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ভুটানকে ‘শেষ ধাপের কয়েকটি বাধার একটি’ বলে মনে করা হচ্ছে। ভারত এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব আর বাড়তে দিতে চায় না। তারা এ অঞ্চলকে নিজের প্রভাববলয় বলে মনে করে থাকে।
বাংলাদেশ, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কাসহ এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বেইজিংয়ের ঋণ ও নানা চুক্তি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে আছে ভারত। ভারত ঘিরে চীনের প্রভাব বলয় গড়ে তোলার বিষয়ে বেশ সতর্ক দৃষ্টি রাখছে নয়াদিল্লি। ভারতের সঙ্গে তার প্রায় সব প্রতিবেশির সঙ্গে সম্পর্কের তিক্ততা রয়েছে।
থিম্পু ও বেইজিংয়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে ভারত ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি কার্যকরভাবে দেখভাল করে আসছিল। যুক্তরাজ্যের থিংক ট্যাংক চাথাম হাউস গত ডিসেম্বরে এক প্রতিবেদনে লিখেছিল, ‘অবাধ বাণিজ্য ও নিরাপত্তাব্যবস্থার’ বিনিময়ে ভারত-ভুটানের ওই সম্পর্ক বজায় ছিল।
ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুকের সঙ্গে রানী জেতসুন ফেমা
প্রতিবেদনটিতে উপগ্রহ থেকে তোলা কিছু ছবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভুটানের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তে চীনের ‘অননুমোদিত নির্মাণকাজের’ বিষয়টিও ছবিতে স্থান পেয়েছে। এ অঞ্চলে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে ‘এই ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে চীনের’ হয়ে যেতে পারে। এ কারণে দুই দেশের সীমান্ত চুক্তি অনেক দিন ধরে মুলতবি অবস্থায় ছিল।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতির মাধ্যমে বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ভুটানের সঙ্গে সীমান্ত ইস্যুর দ্রুত সমাধান এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে চীন বদ্ধপরিকর। চাথাম হাউস বলেছে, বেইজিংয়ের ধারণা, একটি চুক্তির ফলে ভুটানের উত্তরাঞ্চলে তাদের অবস্থান সংহত হবে। পাশাপাশি ভুটানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং থিম্পুকে চীনের বলয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি এবং দুই দেশের ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার (২ হাজার ১৭৫ মাইল) দীর্ঘ সীমান্ত নিয়ে সতর্ক রয়েছে নয়াদিল্লি। এ সীমান্ত বারোমাসি উত্তেজনার একটি বড় উৎস।
২০১৭ সালে চীন-ভারত-ভুটান সীমান্তবর্তী বিতর্কিত ডোকলাম মালভূমির দিকে চীনা সৈন্যরা অগ্রসর হলে ভারত ও চীনের মধ্যে ৭২ দিনের সামরিক অচলাবস্থা দেখা দিয়েছিল। এই মালভূমি দক্ষিণে ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত ভারতের শিলিগুড়ি করিডরের দিকে চলে গেছে। এর দুই পাশে বাংলাদেশ ও নেপাল। এ‘চিকেন নেক’ ভারতের মূল অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সংযুক্ত করে রেখেছে।
চাথাম হাউস বলছে, ভুটানের উত্তরাঞ্চলে সীমান্ত চিহ্নিত করে চুক্তি হয়ে গেলে ভুটানের পশ্চিমাঞ্চলের দিকে চীনের দৃষ্টি যেতে পারে, যেখানে ডোকলাম মালভূমিসহ কিছু এলাকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৬২ সালে চীন ও ভারতের মধ্যে এ অঞ্চলে প্রায় এক মাস যুদ্ধ হয়েছিল যাতে ভারতের শোচনীয়ভাবে পরাজয় হয়েছিল।ভারতের সংবাদপত্র দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক বিভাগের প্রধান সুহাসিনী হায়দার বলছিলেন, চীন-ভুটান সীমান্ত চুক্তি ‘অত্যাসন্ন মনে হচ্ছে’, যা ভারতের জন্য বেশ উদ্বেগের বিষয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভুটানের ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতির ভূমিকা খুব একটা থাকে না। ইউরোপের দেশ সুইজারল্যান্ডের আয়তনের সমপরিমান আয়তনের একটি দেশ হল ভুটান। আট লাখ জনসংখ্যার দেশটির প্রধান সমস্যা বেকারত্ব। আর তরুণদের মধ্যে বিদেশে অভিবাসী হওয়ার প্রবণতা বেশি। অবশ্য ভুটানের বিনিয়োগ ও অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে ভারত। তাই দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুহাসিনী বলেন, ভুটানে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তারা এ সম্পর্ক সুদৃঢ় করার চেষ্টা করবে।
ভারতের সঙ্গে ভুটানের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ভুটানের বাণিজ্যিক অংশীদার, বিদেশি সহায়তার উৎস ও তাদের অতিরিক্ত জলবিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে ভারত বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ভুটানের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীরা আগ্রহের সঙ্গে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেছেন। বিশেষ করে দিল্লির অংশীদারত্বে ভুটানের ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনীতিকে আরও এগিয়ে নিতে আগ্রহী তারা।
ভারত ইতিমধ্যে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে ভুটানের সঙ্গে রেললাইন স্থাপনসহ একগুচ্ছ প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছে। সুহাসিনী বলেন, ভুটান অন্যান্য দেশ থেকেও বিনিয়োগ চাইবে। থিম্পু যদি চীন থেকে বিনিয়োগকে স্বাগত জানায়, তাহলে সেটা হবে ‘গুরুত্বপূর্ণ’।সূত্র: ওয়ান ইন্ডিয়া বাংলা
এনবিএস/ওডে/সি