এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৭ মে, ২০২৫, ০৬:০৫ পিএম
ভারতীয় ক্রিকেটের রাজা বিরাট কোহলির টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা বিশ্ব ক্রিকেটে একটি যুগের অবসান ঘটিয়েছে। রোহিত শর্মার অবসরের মাত্র পাঁচ দিন পর কোহলির এই সিদ্ধান্ত ক্রিকেটপ্রেমীদের হতবাক করেছে। তবে তাঁর প্রতি প্রশংসার বন্যা বইছে। বাংলাদেশের টি-২০ অধিনায়ক লিটন দাস এবং অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি গ্রেগ চ্যাপেল কোহলির অবদানের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।
১২ই মে সোমবার সকালে বিরাট কোহলি ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন, যেখানে তিনি লেখেন, “১৪ বছরের যাত্রাপথ এবার শেষ।” বিসিসিআই তাঁকে ইংল্যান্ড সিরিজ খেলে অবসর নেওয়ার অনুরোধ করলেও কোহলি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। ১২৩ টেস্টে ৯,২৩০ রান, ৩০টি শতক, ৩১টি অর্ধশতক এবং সর্বোচ্চ ২৫৪ রানের অপরাজিত ইনিংস নিয়ে কোহলি থামলেন। তাঁর ব্যাটিং গড় ৪৬.৮৫, যা তাঁকে ভারতের টেস্ট রানসংগ্রাহকদের তালিকায় চতুর্থ স্থানে রেখেছে।
বাংলাদেশের টি-২০ অধিনায়ক লিটন দাস কোহলির অবসরে অবাক হননি। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “কোহলির অবসর আমার কাছে আশ্চর্য নয়। তাঁর সিদ্ধান্তের প্রশংসা করা উচিত। তিনি নিজেই অবসরের সঠিক সময় বেছে নিয়েছেন। কোহলি জানেন কখন খেলতে হবে, কখন থামতে হবে। তাঁর পরিপক্ক সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান জানাই।” লিটন কোহলিকে শুধু ভারতের নয়, বিশ্ব ক্রিকেটের তারকা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, “কোহলি টেস্ট ক্রিকেটের আগ্রাসী মনোভাব বদলে দিয়েছেন। তাঁর মানসিকতা, ক্রিকেটীয় জ্ঞান অতুলনীয়। মাঠে তিনি আগ্রাসী হলেও মাঠের বাইরে অসাধারণ মানুষ। আমি তাঁর সঙ্গে অনেক কথা বলেছি।” লিটনের এই বক্তব্য বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাবের মধ্যেও কোহলির জনপ্রিয়তার প্রমাণ বহন করে।
অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি গ্রেগ চ্যাপেল, যিনি ভারতীয় ক্রিকেটে বিতর্কিত কোচিং সময়ের জন্য পরিচিত, কোহলির অবসরে একটি ক্রিকেট ওয়েবসাইটে লম্বা প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি লেখেন, “কোহলির অবসর এক অসাধারণ যুগের সমাপ্তি। শচীন তেন্ডুলকরের পর কোহলিই ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রভাবশালী চরিত্র। তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের হৃদপিণ্ড ছিলেন, যিনি শুধু রান করেননি, প্রত্যাশার মানদণ্ড নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছেন।” চ্যাপেল কোহলির মানসিক শক্তি ও বিদেশে জয়ের প্রত্যয়ের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “সৌরভ গাঙ্গুলি ভারতকে মেরুদণ্ড দিয়েছিলেন, ধোনি সাদা বলে রাজত্ব শিখিয়েছিলেন, কিন্তু কোহলি আগুন জ্বালিয়েছিলেন। তিনি ভারতকে শুধু লড়তে নয়, বিদেশে জিততে শিখিয়েছেন।”
চ্যাপেল কোহলির দুটি টেস্ট সিরিজের উল্লেখ করেন। ২০১৪ সালে ইংল্যান্ড সফরে জিমি অ্যান্ডারসনের সুইংয়ের কাছে কোহলির দুর্বলতা প্রকাশ পায়। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। কোচ লালচাঁদ রাজপুত ও শচীনের পরামর্শ নিয়ে নিজেকে নতুন করে গড়েন। ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে তিনি ৫৯৩ রান করেন, যার মধ্যে এজবাস্টনে ১৪৯ ও একটি অর্ধশতক ছিল। চ্যাপেল বলেন, “কোহলি ব্যর্থতাকে উৎপাটন করে লোকগাথা তৈরি করেছেন।”
২০১৮-১৯ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে কোহলির নেতৃত্বে ভারত প্রথমবার টেস্ট সিরিজ জয় করে। চ্যাপেল লেখেন, “পার্থে কোহলির ১২৩ রান ছিল যুগন্ধর। ভারত ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতে অস্ট্রেলিয়ায় ভারতীয় ক্রিকেটের হীনম্মন্যতা দূর করে।” তিনি কোহলিকে “অস্ট্রেলিয়ান মনোভাবের” ক্রিকেটার হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যিনি যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়েননি। চ্যাপেলের মতে, কোহলির মতো প্রাণশক্তিসম্পন্ন ক্রিকেটারের শূন্যতা পূরণ করা কঠিন।
কোহলির অবসর ভারতীয় ক্রিকেটে একটি শূন্যতা তৈরি করেছে। তাঁর আগ্রাসী মনোভাব, নেতৃত্ব এবং বিদেশে জয়ের সংস্কৃতি ভারতীয় ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। লিটন দাসের মতো প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় এবং গ্রেগ চ্যাপেলের মতো কিংবদন্তি কোচের প্রশংসা প্রমাণ করে কোহলি কেবল ভারতের নন, বিশ্ব ক্রিকেটের রাজা। তবে তাঁর হঠাৎ অবসর নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়—কেন তিনি ইংল্যান্ড সিরিজের অপেক্ষা করলেন না? ভক্তরা এখন অপেক্ষায় আছেন কোহলি নিজে এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ প্রকাশ করেন কিনা।
বিরাট কোহলির টেস্ট অবসর ক্রিকেট জগতে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, কিন্তু তাঁর কিংবদন্তি চিরকাল বেঁচে থাকবে। লিটন দাস ও গ্রেগ চ্যাপেলের প্রশংসা প্রমাণ করে কোহলি শুধু মাঠে নয়, মাঠের বাইরেও সত্যিকারের রাজা।