এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৫ মে, ২০২৫, ১২:০৫ পিএম
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলা এখন যেন একটি চ্যালেঞ্জিং স্বপ্ন। পাকিস্তান সুপার লিগ -পিএসএল এবং ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ -আইপিএলের মতো বড় মঞ্চে বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা প্রায়ই সুযোগ পাচ্ছেন অন্য খেলোয়াড়দের শূন্যস্থান পূরণের জন্য। সম্প্রতি মেহেদী হাসান মিরাজ পিএসএলে লাহোর কালান্দার্সের হয়ে সুযোগ পেয়েছেন, কিন্তু তিনিও এসেছেন জিম্বাবুয়ের সিকান্দার রাজার বিকল্প হিসেবে। এই প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব, কেন বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের ভাগ্য এখন শূন্যস্থান পূরণের ওপর নির্ভর করছে। বিস্তারিত জানতে আমাদের সঙ্গেই থাকুন।
মেহেদী হাসান মিরাজ বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটি উজ্জ্বল নাম। এপ্রিলে আইসিসি মাসসেরা টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। সর্বশেষ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ -বিপিএলে তিনি ছিলেন সেরা খেলোয়াড়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, জাতীয় টি-টোয়েন্টি দলে তার জায়গা হয়নি। এমন একজন প্রতিভাবান অলরাউন্ডারের জন্য পিএসএলে সুযোগ এসেছে জিম্বাবুয়ের সিকান্দার রাজার ইংল্যান্ডে টেস্ট খেলতে যাওয়ার কারণে। লাহোর কালান্দার্স মেহেদীকে বেছে নিয়েছে তাদের অফস্পিনিং অলরাউন্ডার হিসেবে। এটি তার জন্য নিজের সামর্থ্য প্রমাণের একটি বড় সুযোগ।
কিন্তু মেহেদী একা নন। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য বিদেশি লিগে খেলার সুযোগ প্রায়ই আসছে অন্য কারো শূন্যস্থান পূরণের মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ, সাকিব আল হাসান এবং মুস্তাফিজুর রহমানের কথা বলা যাক। এই দুই তারকা একসময় আইপিএল-এ নিয়মিত মুখ ছিলেন। সাকিব কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে দুইবার আইপিএল শিরোপা জিতেছেন। মুস্তাফিজ ২০১৬ সালে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু এবার তারা দুজনেই সুযোগ পেয়েছেন শুধুমাত্র বিকল্প হিসেবে।
সাকিব লাহোর কালান্দার্সে নিউজিল্যান্ডের ড্যারেল মিচেলের বদলি হিসেবে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। ছয় মাস পর তিনি আবার পিএসএল-এ ফিরেছেন। অন্যদিকে, মুস্তাফিজুর রহমান দিল্লি ক্যাপিটালসে অস্ট্রেলিয়ার জ্যাক ফ্রেজার ম্যাকগার্কের বদলি হিসেবে নেওয়া হয়েছেন, যদিও বাস্তবে তিনি মিচেল স্টার্কের জায়গায় খেলছেন। এই দুজনের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, তাদের সুযোগ এসেছে অন্য কারো অনুপস্থিতির কারণে। এটি বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের জন্য একটি দুঃখজনক প্রবণতা।
এই প্রবণতা শুধু সাকিব বা মুস্তাফিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পিএসএল-এ লিটন কুমার দাস করাচি কিংসের হয়ে সুযোগ পেয়েছিলেন ড্রাফটের মাধ্যমে। কিন্তু আঙুলের চোটের কারণে তিনি টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ফিরে আসেন। রিশাদ হোসেন এবং নাহিদ রানাও পিএসএল-এ সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার কারণে তাদের বিশেষ ফ্লাইটে দেশে ফিরতে হয়। এই ঘটনাগুলো দেখায়, বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের জন্য বিদেশি লিগে টিকে থাকা কতটা কঠিন।
একসময় বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা আইপিএল-এ ড্রাফটের মাধ্যমে সরাসরি দল পেতেন। আব্দুর রাজ্জাক, মাশরাফি বিন মর্তুজা, মোহাম্মদ আশরাফুল এবং তামিম ইকবালের মতো খেলোয়াড়রা আইপিএলে খেলেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে শুধু সাকিব এবং মুস্তাফিজই উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। সাকিব ও মুস্তাফিজের পারফরম্যান্সের কারণে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের চাহিদা বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা কমেছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। সাকিবের ক্ষেত্রে, সন্দেহজনক বোলিং অ্যাকশনের কারণে তিনি এবার আইপিএল ড্রাফটে বিবেচিত হননি। মুস্তাফিজের কোনো এমন সমস্যা না থাকলেও তিনি শুরুতে কোনো দল থেকে ডাক পাননি। লিটন কুমার দাস কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে আইপিএল-এ খেলেছিলেন, কিন্তু তার পারফরম্যান্স স্মরণীয় হয়নি। ফলে পরবর্তীতে কোনো দল তাকে নেয়নি। এই ঘটনাগুলো দেখায়, বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের জন্য বিশ্বের শীর্ষ লিগগুলোতে স্থান ধরে রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, মেহেদী হাসান মিরাজের মতো খেলোয়াড়রা প্রমাণ করছেন যে সুযোগ পেলে তারা বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল হতে পারেন। মেহেদীর পিএসএল-এ অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে, এই শূন্যস্থান পূরণের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের নিয়মিত ড্রাফটের মাধ্যমে দল পাওয়া দরকার। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের আরও প্রতিষ্ঠিত করা।
বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন একটি ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। সাকিব, মুস্তাফিজ, মেহেদী কিংবা লিটন—এই খেলোয়াড়রা প্রমাণ করেছেন, তারা বিশ্বমানের প্রতিভা। কিন্তু বিদেশি লিগে তাদের সুযোগ নির্ভর করছে অন্যের শূন্যস্থানের ওপর। এই প্রবণতা ভাঙতে হলে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের আরও ধারাবাহিকভাবে নিজেদের প্রমাণ করতে হবে। ভবিষ্যতে আমরা আশা করি, বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা শুধু বিকল্প নয়, প্রথম পছন্দ হিসেবে বিশ্বের শীর্ষ লিগে জায়গা করে নেবেন।
বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের জন্য বিদেশি লিগে শূন্যস্থান পূরণের এই চ্যালেঞ্জ একটি নতুন শুরুর সুযোগও হতে পারে। মেহেদী হাসান মিরাজের পিএসএল যাত্রা আমাদের আশা জাগায়।