এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৫, ০৯:০৭ পিএম
কেন উইলিয়ামসন—নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট কিংবদন্তি! ২০১০ সালে অভিষেক থেকে ২০২১ সালে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয়, তিনি প্রমাণ করেছেন কেন তিনি ‘ফ্যাব ফোর’-এর একজন। তার শান্ত নেতৃত্ব ও নিখুঁত ব্যাটিং কীভাবে নিউজিল্যান্ডকে বিশ্ব মঞ্চে নিয়ে গেছে? কীভাবে তিনি আইপিএল-এ ২০১৮ সালে অরেঞ্জ ক্যাপ জিতলেন? এই গল্পে রয়েছে প্রতিভা, ধৈর্য আর সাফল্য।
কেন, তার শান্ত ও মার্জিত ব্যাটিং দিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখেছেন। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকে তিনি নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছেন। তার নেতৃত্বে দলটি ২০২১ সালে প্রথম আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করে। আজ আমরা তার এই অসাধারণ যাত্রার গল্প তুলে ধরব।
কেন উইলিয়ামসন ১৯৯০ সালের ৮ আগস্ট নিউজিল্যান্ডের তাউরাঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবারে ক্রীড়া ছিল একটি সাধারণ ধারা। তার বাবা ব্রেট ক্লাব ক্রিকেট খেলতেন, আর মা স্যান্ড্রা ছিলেন প্রতিনিধিত্বমূলক বাস্কেটবল খেলোয়াড়। কেন এবং তার যমজ ভাই লোগান, যিনি তার থেকে এক মিনিটের ছোট, ক্রিকেটের প্রতি ছোটবেলা থেকেই আকৃষ্ট হন। এই পরিবেশ তাকে ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
১৪ বছর বয়সে কেন সিনিয়র প্রতিনিধিত্বমূলক ক্রিকেট খেলা শুরু করেন। তাউরাঙ্গা বয়েজ কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি তার ক্রিকেট দক্ষতা বিকাশ করেন। ২০০৭ সালে, মাত্র ১৭ বছর বয়সে, তিনি নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্টসের হয়ে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক করেন। তার এই প্রাথমিক সাফল্য তাকে ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়কত্ব এনে দেয়।
২০০৮ সালে মালয়েশিয়ায় অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে কেন নিউজিল্যান্ডকে সেমিফাইনালে নিয়ে যান, যদিও ভারতের কাছে হেরে যায় দল। তার নেতৃত্ব ও ব্যাটিং দক্ষতা তাকে জাতীয় দলের দরজায় নিয়ে আসে। ২০১০ সালে ভারতের বিপক্ষে ওডিআই অভিষেকে তিনি ডাক মারলেও, একই বছর বাংলাদেশের বিপক্ষে তার প্রথম ওডিআই সেঞ্চুরি করেন, যা তাকে নিউজিল্যান্ডের সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান করে।
২০১০ সালের ৪ নভেম্বর কেন ভারতের বিপক্ষে আহমেদাবাদে টেস্ট অভিষেকে ১৩১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন। এটি তাকে নিউজিল্যান্ডের অষ্টম ক্রিকেটার করে, যিনি টেস্ট অভিষেকে সেঞ্চুরি করেন। তার এই ইনিংস তার প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং ধৈর্যের প্রমাণ দেয়। এই ইনিংসের মাধ্যমে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেন।
২০১১ সালে কেন ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটে গ্লুচেস্টারশায়ারের হয়ে খেলেন। ২০১৩ সালে তিনি ইয়র্কশায়ারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন, যেখানে তিনি ২০১৪ সালে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ে অবদান রাখেন। ২০২৫ সালে তিনি মিডলসেক্স এবং লন্ডন স্পিরিটের হয়ে খেলেন, যেখানে তিনি মিডলসেক্সের হয়ে অভিষেকে সেঞ্চুরি করেন। এই পারফরম্যান্স তার ধারাবাহিকতা এবং অভিযোজন ক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
২০১৬ সালে ব্রেন্ডন ম্যাককালামের অবসরের পর কেন নিউজিল্যান্ডের সর্ব ফরম্যাটের অধিনায়ক নিযুক্ত হন। তার নেতৃত্বে নিউজিল্যান্ড ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পৌঁছায়। তার শান্ত ও কৌশলগত নেতৃত্ব দলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ২০১৯ সালে তিনি নিউজিল্যান্ডকে ওডিআই বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে যান, যেখানে তিনি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।
২০১৯ সালের ওডিআই বিশ্বকাপে কেন ৫৭৮ রান করে ‘প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্ট’ পুরস্কার জিতেন। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তার দুটি সেঞ্চুরি এবং ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ৬৭ রান নিউজিল্যান্ডকে ফাইনালে নিয়ে যায়। তবে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাউন্ডারি কাউন্টে হেরে দল শিরোপা হারায়। তার নেতৃত্ব এবং ব্যাটিং বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়।
২০২১ সালে কেন নিউজিল্যান্ডকে প্রথম আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ে নেতৃত্ব দেন। ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে তার ৪৯ এবং অপরাজিত ৫২ রান দলকে ঐতিহাসিক জয় এনে দেয়। এই জয় নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম আইসিসি শিরোপা হিসেবে চিহ্নিত হয়। কেনের শান্ত মনোভাব এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত এই জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২০২১ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কেন নিউজিল্যান্ডকে ফাইনালে নিয়ে যান, যদিও অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারে দল। তার ৮৫ রানের ইনিংস ফাইনালে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর হিসেবে রেকর্ড গড়ে। ২০২২ সালে তিনি টেস্ট অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়ান, টিম সাউদিকে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ২০২৪ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে ব্যর্থতার পর তিনি হোয়াইট-বল অধিনায়কত্ব ত্যাগ করেন।
কেনের টেস্ট ক্যারিয়ার অসাধারণ। ২০২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তিনি নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ টেস্ট রান সংগ্রাহক হন। ১০৩ ম্যাচে তিনি ৮,৮৭৪ রান করেছেন, গড় ৫৫.৪৬। তার সর্বোচ্চ স্কোর ২৫১। তিনি ৩৩টি সেঞ্চুরি এবং ৬টি ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন, যা নিউজিল্যান্ডের যৌথ-সর্বোচ্চ। তিনি সব টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করা ত্রয়োদশ ব্যাটার।
ওডিআইতে কেন ১৬৫ ম্যাচে ৬,৮১০ রান করেছেন, গড় ৪৮.৩৬। তার সর্বোচ্চ স্কোর ১৪৮। ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি ২০৬০ দিন পর প্রথম ওডিআই সেঞ্চুরি করেন। তিনি বিশ্বের পঞ্চম দ্রুততম ব্যাটার হিসেবে ৬,০০০ ওডিআই রান পূর্ণ করেন। তার ধারাবাহিকতা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার ক্ষমতা তাকে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিংয়ের মূল স্তম্ভ করে।
টি-টোয়েন্টিতে কেন ৯৩ ম্যাচে ২,৫৭১ রান করেছেন, গড় ৩৩.৩৮ এবং স্ট্রাইক রেট ১২২.৫৪। তিনি ১৮টি অর্ধশতক করেছেন, কিন্তু কোনো সেঞ্চুরি নেই। তার সর্বোচ্চ স্কোর ৮৫। ২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তিনি দলকে সেমিফাইনালে নিয়ে যান। তার শান্ত ব্যাটিং শৈলী টি-টোয়েন্টিতে কিছুটা সমালোচিত হলেও, তিনি দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেছেন।
আইপিএল-এ কেন ২০১৫ সালে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের হয়ে অভিষেক করেন। ২০১৬ সালে তিনি দলকে শিরোপা জয়ে সহায়তা করেন। ২০১৮ সালে অধিনায়ক হিসেবে তিনি ৭৩৫ রান করে অরেঞ্জ ক্যাপ জিতেন এবং দলকে ফাইনালে নিয়ে যান। ৭৯ ম্যাচে তিনি ২,১২৮ রান করেছেন, গড় ৩৫.৪৭। ২০২৩ সালে গুজরাট টাইটান্সে যোগ দেন, কিন্তু ইনজুরির কারণে পুরো মৌসুম খেলতে পারেননি।
২০২৪ সালে গুজরাট টাইটান্স তাকে ধরে রাখে, কিন্তু ২০২৫ আইপিএল নিলামে তিনি বিক্রি হননি। এরপর তিনি পাকিস্তান সুপার লিগে করাচি কিংসের হয়ে ২০২৫ মৌসুমে খেলার সুযোগ পান। তার আইপিএল ক্যারিয়ারে ১৮টি অর্ধশতক রয়েছে, যদিও ২০২২ সালে তার ফর্ম ম্লান ছিল। তার ব্যাটিং শৈলী আইপিএল-এর আগ্রাসী প্রকৃতির সাথে পুরোপুরি মেলেনি।
কেনের ক্যারিয়ারে ইনজুরি একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। ২০২১ সালে কনুইয়ের ইনজুরি এবং ২০২৩ সালে আইপিএল-এ হাঁটুর ইনজুরি তাকে পিছিয়ে দেয়। তবুও তিনি দৃঢ়তার সাথে ফিরে আসেন। ২০২৩ সালের ওডিআই বিশ্বকাপে তিনি ইনজুরি সত্ত্বেও নেতৃত্ব দেন, কিন্তু সেমিফাইনালে ভারতের কাছে হারে নিউজিল্যান্ড। তার ফিটনেস এবং পুনরুত্থান তাকে ক্রিকেটের একজন যোদ্ধা করে।
২০২৫ সালে কেন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডকে ফাইনালে নিয়ে যান, যদিও ভারতের কাছে হারে দল। তার ব্যাটিং এবং নেতৃত্ব এই টুর্নামেন্টে প্রশংসিত হয়। তিনি ২০১৫, ২০১৯ এবং ২০২৩ ওডিআই বিশ্বকাপে এবং ২০১২, ২০১৪, ২০১৬, ২০২১, ২০২২ এবং ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার ধারাবাহিকতা তাকে বিশ্বের শীর্ষ ব্যাটারদের একজন করে।
কেনের পুরস্কারের তালিকা চিত্তাকর্ষক। তিনি ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ সালে স্যার রিচার্ড হ্যাডলি মেডেল জিতেন। ২০১৮ সালে তিনি আইসিসি টেস্ট একাদশের অধিনায়ক নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালে তিনি বিশ্বকাপের ‘প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্ট’ এবং ২০২১ সালে টেস্ট একাদশের অধিনায়ক হন। তিনি ২০১১-২০২০ দশকের আইসিসি টেস্ট দলে একমাত্র নিউজিল্যান্ডের প্রতিনিধি।
কেনের ব্যাটিং শৈলী তাকে ‘স্টেডি দ্য শিপ’ উপাধি এনে দিয়েছে। তার নিখুঁত টেকনিক, দ্রুত পায়ের কাজ এবং স্পিন ও পেস উভয়ের বিরুদ্ধে খেলার ক্ষমতা তাকে আলাদা করে। মার্টিন ক্রো তাকে নিউজিল্যান্ডের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাটার হিসেবে অভিহিত করেন। ভিরাট কোহলি, স্টিভ স্মিথ এবং জো রুটের সাথে তিনি ‘ফ্যাব ফোর’-এর একজন হিসেবে বিবেচিত হন।
কেনের ব্যক্তিগত জীবনও তার ক্রিকেটের মতোই স্থিতিশীল। ২০১৫ সালে তিনি সারাহ রাহিমের সাথে সম্পর্কে জড়ান, যিনি একজন ব্রিটিশ নার্স। তাদের দুটি কন্যা এবং একটি পুত্র রয়েছে। তিনি তাউরাঙ্গায় একটি সুন্দর বাড়ির মালিক এবং ক্রিকেটের বাইরে তার পরিবারের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করেন। তার নম্র ও শান্ত স্বভাব তাকে ভক্তদের কাছে প্রিয় করে তুলেছে।